এইখানে এক বাঁওড় ছিল

আপডেট: 08:21:57 01/03/2020



img

বিশেষ প্রতিনিধি, ঝিনাইদহ : মহেশপুরের ভাবদিয়া বাঁওড়ের সরকারি ১২৬ বিঘা জমিই সরকারের হাতছাড়া হতে চলেছে। ইতিমধ্যে এই জমির পুরোটাই বিভিন্ন ব্যক্তির নামে রেকর্ড হয়েছে। ছাপা পরচা তৈরির কাজও চলছে।
কর্মকর্তারা বলছেন, তারা একাধিক মামলা করেও সরকারি এই জমি রক্ষায় এখনো সমর্থ হননি। তবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
অন্যদিকে স্থানীয়রা বলছেন, কর্মকর্তা মামলা দিয়েই তাদের দায়িত্ব শেষ করছেন। অদৃশ্য কারণে তারা মামলায় কোনো ভূমিকা রাখেন না। যে কারণে জমি রক্ষায় শেষ পর্যন্ত ব্যর্থতা আসে।
আর দলখদাররা বলছেন, জমিটি এক সময় সরকারি বাঁওড় ছিল। তারা চাষাবাদ করে আসছিলেন। এরপর আরএস রেকর্ডের সময় তাদের নামে রেকর্ড হয়েছে। সরকার দখল নিলে তারা ছেড়ে দেবেন।
সরেজমিনে মহেশপুর উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের গাড়াপোতা আর ভাবদিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, দুই গ্রামের মাঝ দিয়ে একটি বাঁওড় বয়ে গেছে। যার নাম ভাবদিয়া বাঁওড়। ৪২ একর ৭ শতক সরকারি জমি রয়েছে এই বাঁওড়ে। এই বাঁওড়টি দিয়ে পাশের ৩২৬টি মৌজার মাঠের পানি বড়বিল হয়ে কোদলা নদীতে নেমে যেত। বর্তমানে বাঁওড়ে বড় বড় পুকুর কাটা হয়েছে। দুই গ্রামের অর্ধশত ব্যক্তি এই পুকুরগুলো কেটেছেন। সেখানে তারা মাছের চাষ করেন। এই পুকুরের পাড় উঁচু করায় পানির প্রবাহ থমকে গেছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে মাঠে পানি জমে। এতে কৃষকের ফসল পানিতে ডুবে যায়।
বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা নিকুঞ্জকুমার বিশ্বাসের দেওয়া তথ্য মতে, ভবদিয়া বাঁওড়টি সরকারি। এই বাঁওড়ে ৪২ দশমিক ০৭ শতক জমি আছে। এসএ ও সিএস রেকর্ডে এই জমি সরকারের এক নম্বর খতিয়ানে ছিল। ৬২১ দাগের এই জমিটি আরএস রেকর্ডের প্রায় ৭১ জনের নামে রেকর্ড হয়ে যায়। বিষয়টি ভূমি অফিসের নজরে এলে রেকর্ড সংশোধনের মামলা দেওয়া হয়। বর্তমানে ৭১টি মামলা চলমান রয়েছে।
ব্যক্তি মালিকের নামে রেকর্ড হওয়া জমির ছাপা পরচা তৈরির কাজ চলছে কি-না, সে সম্বন্ধে সঠিক কোনো ধারণা নেই ভূমি কর্মকর্তা নিকুঞ্জের। তবে তিনি জানান, ছাপা পরচা আসার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে জমি সরকারের আছে কি নেই। ‘বাঁওড়ের জমি ব্যক্তি মালিকের নামে যাওয়ার সুযোগ নেই’ উল্লেখ করে এই কর্মকর্তা বলেন, ছাপা পরচা আসার পরও জমি ফেরত নেওয়া সম্ভব।
ভাবদিয়া গ্রামের বাসিন্দা বাঁশবাড়িয়া ইউনিয়নের ছয় নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার বেলাল হোসেন জানান, দেখতে দেখতে বাঁওড়টি দখল হয়ে গেল। এই বাঁওড় দিয়ে ৩২৬ মৌজার মাঠের পানি বের হতো; যা পুকুর কাটার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, দুই গ্রামের মানুষেরা বাঁওড়ের জমি দখল করেছে। প্রথমে তারা বাঁওড়ের পাড়ে চাষাবাদ শুরু করে। এরপর পুকুর কাটতে থাকে। আনুমানিক ২৫ বছর আগে এই পুকুরগুলো কাটা হয়। অল্প দিনেই অসংখ্য পুকুর তৈরি হয়ে যায়। এভাবে গোটা বাঁওড়ের জমি সরকারের হাতছাড়া হয়ে যায়।
তিনি আরো জানান, দখলদাররা জমি দখলে রাখার পর আরএস রেকর্ডের সময় রেকর্ড কর্তাদের সঙ্গে আঁতাত করে নিজেদের নামে রেকর্ড করিয়ে নেন। সেই থেকে তারাই জমির মালিক বলে প্রচার দিচ্ছেন। সরকারের কোনো জমি এখানে নেই বলে প্রচার করা হচ্ছে।
গাড়াপোতা গ্রামের এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করে জানান, একটি সময় ছিল তারা বাঁওড়ে মাছ ধরতে নামতেন। মাছ ধরার উৎসব চলতো। দেশি সব মাছ পাওয়া যেত। বাঁওড় পাড়ের মানুষকে মাছ কিনতে হতো কম। আবার অনেকে এই মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে সংসার চালাতেন। এখন এগুলো স্বপ্নের মতো মনে হয়। 
এ ব্যাপারে দখলদারদের একজন আব্দুল হক জানান, জায়গাটি বাঁওড়ের ছিল। তারা প্রথমে বাঁওড়ের ধারে চাষাবাদ করতেন। কিছু জমি ভূমিহীনদের নামেও বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। পরে তারা ভূমিহীনদের কাছ থেকে কেনেন। এভাবে তারা জমির মালিক হয়েছেন। বর্তমানে তারা ওই জমিতে পুকুর কেটে চাষাবাদ করছেন।
তিনি আরো জানান, আরএস রেকর্ডে জমি তাদের নামে রেকর্ড হয়েছে। বর্তমানে জমি তাদের দখলে আছে। সরকার সকলের দখল থেকে বাঁওড়ের জায়গা ফেরত নিলে তিনিও ছেড়ে দেবেন। তিনি অবশ্য স্বীকার করেন এই বাঁওড়ের ওপর দিয়ে বড় বিলের পানি কোদলা নদীতে যেতো। এখন আর পানির প্রবাহ কম। ফলে বিলের পানি বেশিদিন জমে থাকে না।
বাঁওড়ে পুকুর আছে এমন আরেকজন মোমেনা খাতুন জানান, জমিটি তাদের নামে রেকর্ড হয়েছে। তারাই এই জমির মালিক।
আরেক দখলদার নাম প্রকাশ না করে জানান, এভাবে বাঁওড় দখল হয়ে যাবে সেটা তিনিও চাননি। কিন্তু সকলে দখল করছে দেখে তিনিও করেছেন। তবে বাঁওড় তার আগের জায়গায় ফিরে যাবে এটা তিনিও প্রত্যাশা করেন।

আরও পড়ুন