আফগানিস্তান থেকে সব সৈন্য সরাবে আমেরিকা

আপডেট: 09:34:57 14/04/2021



img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক : আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে তার দেশের সৈন্যদের ফিরিয়ে নেওয়ার কথা ঘোষণা করবেন বলে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা মার্কিন সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন।
এর আগে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তালেবানের চুক্তি হয়েছিল যে, মে মাসের মধ্যে সব সৈন্য প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে।
এখন নতুন যে সময়সীমার কথা বলা হচ্ছে তার ঠিক ২০ বছর আগে ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র এবং পেন্টাগনের ওপর সন্ত্রাসী হামলা চালানো হয়েছিল।
এর আগে প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলেছিলেন ১ মে তারিখের মধ্যে সব সৈন্য প্রত্যাহার করে নেওয়ার কাজ কঠিন হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে নেটোর প্রায় দশ হাজার সৈন্য অবস্থান করছে আফগানিস্তানে। তাদের মধ্যে মার্কিন সৈন্যের সংখ্যা আড়াই হাজার। গত দুই দশকের যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে দুই হাজারের মতো মার্কিন সৈন্য।
যুক্তরাষ্ট্র এবং নেটোর কর্মকর্তারা বলছেন, সহিংসতা কমানোর ব্যাপারে তালেবান যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সেটা তারা পূরণ করতে পারেনি।
এই খবরটি জানাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা সাংবাদিকদের বলেছেন, তালেবানকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে যে, সৈন্য প্রত্যাহারের এই সময়কালে মার্কিন সেনাদের ওপর হামলা চালানো হলে "শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে তার জবাব দেওয়া হবে।"
তিনি বলেছেন, তাড়াহুড়ো করে সৈন্য প্রত্যাহার করা হলে সেটা একটা ঝুঁকি তৈরি করবে বলে প্রেসিডেন্ট বাইডেন এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এছাড়াও তিনি বলেছেন, পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, আফগানিস্তানে ২০ বছর ধরে চলা "সংঘাতের এই বইটি (অধ্যায়) এখনই বন্ধ করে দেওয়ার সময়।"
প্রেসিডেন্ট বাইডেন বুধবার নিজে এই ঘোষণা দেবেন বলে কথা রয়েছে।
সন্দেহ নেই কুড়ি বছর আগে তালেবানকে ক্ষমতা থেকে হটানোর পর এখনকার আফগানিস্তান একেবারেই ভিন্ন এক দেশ।
কিন্তু অনেকেই যেমন বলছেন যে, সৈন্য প্রত্যাহারের পর দেশটি শান্তির পথে অগ্রসর হতে পারে, তেমনি অনেকে আশঙ্কা করছেন যে এর ফলে আফগানিস্তান আবার সহিংসতায় নিপতিত হতে পারে।
কাবুলে ইন্সটিটিউট অফ ওয়ার অ্যান্ড পিস স্টাডিজের নির্বাহী সভাপতি তামিম আসে সতর্ক করে দিয়েছেন, "আশা করা যেতে পারে, সৈন্য প্রত্যাহারের এই সময়সীমা ঘোষণার ফলে একটা রাজনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে আফগান দলগুলোর ওপর চাপ তৈরি হবে অথবা সিরিয়ার মতো রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধও শুরু হয়ে যেতে পারে।"
আফগানিস্তানে বিবিসির সংবাদদাতা সেকান্দার কেরমানি বলছেন, সেখানে অনেকেই মনে করেন যে এই সিদ্ধান্ত তালেবানকে চাঙ্গা করবে, যদিও এটি তালেবানের সঙ্গে হওয়া সমঝোতার লঙ্ঘন।
তিনি বলছেন, তারা যে মার্কিন সৈন্যদের ওপর এই অল্প সময়ের মধ্যে হামলা শুরু করবে সেই সম্ভাবনা কম। তার পরেও তালেবান যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এই সিদ্ধান্তকে ভালোভাবে গ্রহণ করেনি।
"আফগান সরকারের কেউ কেউ আশা করেছিলেন যে, নতুন বাইডেন প্রশাসন শান্তি প্রক্রিয়ায় আরো কিছু শর্ত বেঁধে দেবে। কিন্তু সেরকম কিছু করা হয়নি।"
তিনি বলছেন, "আফগান সরকার ও তালেবানের মধ্যে যে ধীরগতিতে শান্তি আলোচনা চলছে তাতে মনে হচ্ছে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের আগে তাদের পক্ষে ক্ষমতা ভাগাভাগির কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো কঠিন হবে।"
"তবে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, তালেবান হয়তো সৈন্য প্রত্যাহার করে নেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে এবং তার পরেই বিজয় অর্জন কিম্বা অন্তত আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা চালাবে।"
সেকান্দার কেরমানি বলেন, তালেবানকে প্রতিহত করতে আফগান সরকার এখনো পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার ওপর নির্ভরশীল।
এমাসের শেষের দিকে আফগানিস্তানের ভবিষ্যতের বিষয়ে তুরস্কে যে সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে, তালেবান তাতে যোগ দেবে না বলে জানিয়ে দিয়েছে।
তালেবানের একজন মুখপাত্র মোহাম্মদ নাঈম টুইট করে বলছেন, "সব বিদেশি সৈন্য আফগানিস্তান ছেড়ে না যাওয়া পর্যন্ত আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণী কোনো সম্মেলনে আমরা অংশগ্রহণ করব না।"
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী লয়েড অস্টিন বুধবার বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে তাদের সিদ্ধান্তের বিষয়ে নেটোর মিত্র দেশগুলোকে অবহিত করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আফগানিস্তান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘতম যুদ্ধ এবং এই যুদ্ধে তারা হাজার হাজার কোটি ডলার খরচ করেছে। গত ২০ বছরের এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের দুই হাজারেরও বেশি সৈন্য ও কর্মকর্তা নিহত হয়েছে।
গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে যে চুক্তি সই হয়েছিল তাতে বলা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও নেটো ১৪ মাসের মধ্যে তাদের সব সৈন্য প্রত্যাহার করে নেবে যদি তালেবান হামলা না করার ব্যাপারে তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বজায় রাখে।
একই সাথে তালেবানের পক্ষ থেকে তাদের হাজার হাজার বন্দীকে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছিল।
এরপর ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দোহায় সরাসরি শান্তি আলোচনা শুরু হয়, কিন্তু এখনও কোন সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি।
সমঝোতার পর তালেবান আন্তর্জাতিক সৈন্যদের ওপর হামলা বন্ধ রাখলেও তারা আফগান সরকারের ওপর আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে।
অবশ্য তালেবান গত মাসে হুমকি দিয়েছে যে ১লা মে থেকে যেসব বিদেশি সৈন্য আফগানিস্তানে অবস্থান করবে তাদের ওপর হামলা চালানো শুরু হবে।
এই আশঙ্কাও আছে যে কার্যকর কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর আগে বিদেশি সৈন্য প্রত্যাহার করা হলে তালেবান ক্ষমতা দখল করে নিতে পারে।

আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি
অক্টোবর ২০০১: যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ১১ই সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আফগানিস্তানে আক্রমণ শুরু হয়।
ফেব্রুয়ারি ২০০৯: নেটোর সদস্য দেশগুলো আফগানিস্তানে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির অঙ্গীকার করে। যুক্তরাষ্ট্র আরো ১৭ হাজার সৈন্য পাঠানোর কথা ঘোষণা করে।
ডিসেম্বর ২০০৯: মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা মার্কিন সৈন্য সংখ্যা আরো ৩০ হাজার বাড়ানোর কথা ঘোষণা করেন। এর ফলে মোট সৈন্য সংখ্যা দাঁড়াবে এক লাখ। তিনি বলেন ২০১১ সালের মধ্যে সৈন্য প্রত্যাহার শুরু হবে।
অক্টোবর ২০১৪: যুক্তরাষ্ট্র এবং ব্রিটেন আফগানিস্তানে তাদের সরাসরি যুদ্ধ অবসানের কথা ঘোষণা করে।
মার্চ ২০১৫: আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানির অনুরোধের পর প্রেসিডেন্ট ওবামা সৈন্য প্রত্যাহার বিলম্বিত করার কথা ঘোষণা করেন।
অক্টোবর ২০১৫: প্রেসিডেন্ট ওবামা ঘোষণা করেন ২০১৬ সালের শেষ পর্যন্ত ৯,৮০০ মার্কিন সৈন্য আফগানিস্তানে অবস্থান করবে। এর আগে তিনি এক হাজার সৈন্য রেখে বাকি সব সৈন্য প্রত্যাহারের কথা ঘোষণা করেছিলেন।
জুলাই ২০১৬: প্রেসিডেন্ট ওবামা বলেন, নিরাপত্তা-জনিত কারণে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ৮,৪০০ মার্কিন সৈন্য আফগানিস্তানে থাকবে। নেটোও সৈন্য মোতায়েন রাখার বিষয়ে সম্মত হয়।
অগাস্ট ২০১৭: তালেবানের সাথে যুদ্ধ করার জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরো সৈন্য পাঠানোর কথা ঘোষণা করেন।
সেপ্টেম্বর ২০১৯: তালেবান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি আলোচনা ভেঙে যায়।
ফেব্রুয়ারি ২০২০: কয়েক মাস ধরে আলোচনার পর দোহায় তালেবানের সাথে সমঝোতা সই হয় যাতে আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহারে করে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সূত্র : বিবিসি

আরও পড়ুন