আনন্দের ঈদ নৈরাশ্যের ঈদ

আপডেট: 09:13:26 26/05/2020



img

আহসান কবীর

আমার ছেলের বয়স নয়। গেল ২৫ মার্চ সে শেষবারের মতো বাড়ির বাইরে গেছে। ঠিক দুই মাস বলতে গেলে ঘরবন্দি এই শিশু। তার আনন্দময় শৈশব বিষাদে পরিণত হয়েছে। এই অবস্থা দীর্ঘায়িত হলে বাচ্চাটি না মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে যায়, এই দুশ্চিন্তায় দিন কাটে আমার।
বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের খরতাপেও ছেলেটি বেশ কয়েকটি রোজা রেখেছে। রোজা শেষ হবে কবে, কবে আসবে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ- ঈদ। সকালে ঈদগাহে যাবে। পরিবার-সদস্য আর বন্ধুদের নিয়ে আনন্দ করবে।
কিন্তু হা কপাল! এবার তার ঈদগাহে যাওয়াও যে মানা। যেদিন ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে বলা হলো, বৃদ্ধ আর শিশুদের ঈদ-জামাতে যেতে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে, খবরটি আমিই তাকে দেখালাম। একরাশ হতাশা নিয়ে মলিন মুখে জানতে চাইলো, 'তাহলে দাদাও কি ঈদের নামাজ পড়তে পারবে না?'
মুসলিম জাহানের সবচেয়ে বড় উৎসব হলো ঈদ। ধর্মীয় বিধানমতে, ধনী-গরিব সবার আনন্দের দিন এটি। কিন্তু এবারের ঈদ এমন সময় এলো, যখন বিশ্বজুড়ে বিরাজ করছে এক অস্বাভাবিক অবস্থা। বাংলাদেশও তার বাইরে নয়। দুই মাস ধরে সংখ্যাগরিষ্ঠ গরিবের এই দেশটি অঘোষিত 'লকডাউনে'। দোকানপাট খুলছে না, গণপরিবহন বন্ধ, মানুষের বাইরে যাওয়া বারণ। গোটা জাতি কার্যত ঘরবন্দি। অর্থনীতির চাকা থমকে গেছে। কর্মহীন মানুষের হাহাকার দিকে দিকে।
করোনাভাইরাসজনিত এই দুর্যোগের মধ্যে 'মড়ার ওপর খাড়ার ঘা' হয়ে এলো সাইক্লোন 'আম্পান'। বঙ্গোপসাগরে উৎপন্ন স্মরণকালের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়টি গত বুধবার দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলাগুলো তছনছ করে দিয়ে গেছে। এখনো পর্যন্ত এই সাইক্লোনের আঘাতে মৃতদের ৪৩ জনের মধ্যে ১৩ জনই যশোরের। এরা সবাই মারা গেছেন গাছ চাপা পড়ে।
শুধু মানুষের জীবনই কেড়ে নেয়নি 'আম্পান'; হাজার হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত করে মানুষকে পথে বসিয়েছে। উড়ে গেছে টিনের চালা। মাঠে থাকা ফল-ফসলাদি ধ্বংস হয়ে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের 'নড়বড়ে' বাঁধ ভেঙে উপকূলীয় তিন জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল এখনো জলমগ্ন। ঘের থেকে ভেসে গেছে কোটি কোটি টাকার মাছ। নিঃস্ব হয়ে গেছেন কয়েক জেলার লাখো মানুষ।
এমন দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে আগে আর কখনো ঈদ পালন করতে হয়েছে কি না সন্দেহ। একাত্তর সালে ঈদ এসেছিল আতঙ্কের মধ্যে। আর এবারের পরিস্থিতি এমনই নাজুক যে, বাড়িতে ঈদের নামাজ আদায় করা যাবে কি-না তা বিচার বিশ্লেষণ করে দেখছেন দুনিয়ার বড় বড় মুসলিম স্কলাররা। স্বাভাবিকভাবেই পক্ষে-বিপক্ষে মতামত আসছে।
আমাদের দেশে ঈদ আনন্দ সবেচেয়ে বেশি উপভোগ করে বাচ্চারা। এর পর যদি কোনো বয়সীদের কথা বলতে হয়, তাহলে তারা হলো তরুণ-যুবা।
লেখার শুরুতেই আমার সন্তানের যে মানসিক কষ্টের কথা উল্লেখ করেছি, আমার ধারণা, ঘরে ঘরে থাকা লাখো শিশুর অবস্থাও একই। তারা এবার ঈদগাহে যেতে পারবে না। কারণ সেখানে ঈদের জামাত হবে না। মসজিদে মসজিদে ঈদ-জামাত হবে এবং ধারণা করছি, সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা না থাকায় সেখানে অনেক শিশুই ঈদের নামাজ আদায় করবে। কিন্তু কওমের ঐতিহ্য অনুযায়ী সমবয়সীদের সাথে কোলাকুলি করতে পারবে না। যেতে পারবে না বন্ধুদের বাড়িতে। অনিশ্চিত হয়ে গেছে ঈদসেলামিও। নতুন পোশাকের আশা তো অনেক আগেই শিঁকেয় উঠেছে।
আর তরুণ-যুবাদের যে হুল্লোড় প্রতি ঈদে দৃশ্যমান হয়, এবার তা সঙ্গত কারণেই অনুপস্থিত। ভয়াবহ ছোঁয়াচে করোনাভাইরাস স্থবির করে দিয়েছে তরুণদের প্রাণচাঞ্চল্য।
বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য কিনতে হয়। একদিন-দুইদিন পর আমাকেও বাজারে যেতে হয়েছে। কিন্তু বাজারে এবারের রোজার মাসে যত ভিখারি দেখেছি, আমার জীবদ্দশায় আগে কখনো তা দেখিনি। বহু মানুষকে দেখেছি সসংকোচে হাত পাততে। বোঝাই যায়, এরা আগে কখনো হাত পাতেননি। করোনা পরিস্থিতিতে কর্মহীন হয়ে পড়ায় পেটের জ্বালায় হাত পাততে বাধ্য হচ্ছেন। শহরে ঢুকতে পৌরসভা কর্তৃপক্ষের বিলবোর্ডে লেখা 'ভিক্ষুকমুক্ত এলাকা' যেন মহাউপহাসে পরিণত হতে চলেছে।
লুটপাটের অর্থনীতি কায়েম হওয়ায় একদল মানুষ গেল পাঁচ দশকে বিত্তের পাহাড় গড়েছে। তারা অবস্থান পোক্ত করেছে রাষ্ট্রপরিচালনায়। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ, যারা উৎপাদনে সরাসরি নিযুক্ত, তাদের অবস্থা খুব যে পাল্টেছে, তা কিন্তু নয়। হয়তো তাদের বাড়িতে বিদ্যুৎ পৌঁছেছে; হাতে উঠেছে মোবাইল ফোন। কিন্তু অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রকট হতে হতে আকাশসমান হয়েছে।
আর মধ্যবিত্ত? হ্যাঁ এই নামে একটি শ্রেণি গড়ে উঠেছে সত্যি। কিন্তু তাদের অবস্থা যে কতটা ভঙ্গুর, এই করোনাকালে তা টের পাওয়া যাচ্ছে হাড়ে হাড়ে। কর্মসংস্থান সংকুচিত হওয়া, রেমিটেন্সের প্রবাহ তলানিতে নামা- ইত্যকার কারণে মাত্র দুই মাসেই সঞ্চয় ভেঙে খেতে বাধ্য হচ্ছে এই শ্রেণি।
রিকশা চালিয়ে, মোটরগাড়িতে কাজ করে, প্রাতিষ্ঠানক/অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে মজুর খেটে বা ক্ষুদ্র ব্যবসা চালিয়ে যেসব মানুষ মাথা উঁচু করে জীবন ধারণ করতেন, গেল কিছুদিন তারাও খাদ্য সাহায্যের আশায় লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। বোঝাই যাচ্ছে, দৈনিক কাজ না করলে এদের পেটে ভাত জোটে না। রাষ্ট্রের যৎকিঞ্চিৎ সাহায্য পৌঁছায় খুব কম মানুষের দোরে। কলকারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়া, আম্পানের আঘাতে ফসল হারানো, ঘর বিধ্বস্ত হয়ে যাওয়া প্রান্তিক চাষিও হয়তো সামনের দিনগুলোতে হাজির হবেন সাহায্যের আশায়। আমরা সেই পরিস্থিতি দেখতে চাই না। তবে মনে হচ্ছে তা অনিবার্য হতে চলেছে।
এমন পরিস্থিতিতে ঈদ কি আনন্দ, নাকি একরাশ নৈরাশ্য নিয়ে হাজির হলো বাঙালি মুসলিমের জীবনে? ঈদের দিন সাধ্যানুযায়ী উত্তম খাবার প্রস্তুত ও ভক্ষণের কথা। কিন্তু চাঁদরাতে যে তরতাজা যুবককে গোরস্থানে দাফন করে এলেন কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের কর্মীরা, সেই তমালের বাড়িতে কি আদৌ কোনো খাবার আজ রান্না হয়েছে? মণিরামপুরের যে খেটে খাওয়া মানুষটির ঘর বিধ্বস্ত করে দিয়েছে আম্পান, তার বাড়িতে হাঁড়ি চড়বে কীভাবে? শ্যামনগরের যে বাড়িটি বাঁধভাঙা জোয়ারে ভেসে গেছে, সেখানে উনুনই বা কোথায়?
আনন্দ-নৈরাশ্য যা-ই হোক না কেন, জাতিকে ঘুরে দাঁড়াতেই হবে। করোনা পরিস্থিতি চিরকাল থাকবে না। শ্রমজীবী মানুষের হাতে উৎপাদন হবে। সমৃদ্ধির পথেই এগুবে দেশ। শত অসঙ্গতি, প্রতিকূলতা সত্ত্বেও।

[লেখক : সম্পাদক, সুবর্ণভূমি]

আরও পড়ুন