আতঙ্কে ব্যাংকাররা, ইলেক্ট্রনিক মানি ট্রান্সফারেও সংকট

আপডেট: 05:53:51 09/04/2020



img

স্টাফ রিপোর্টার : নভেল করোনাভাইরাসের মহামারীর মধ্যে নানা সীমাবদ্ধতার পরও সীমিত পরিসরে সেবা দিয়ে আসছিল ব্যাংকগুলো, কিন্তু অগ্রণী ব্যাংকের এক কর্মকর্তার দেহে সংক্রমণ ধরা পড়ার পর ব্যাংকারদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক।
বিষয়টি কর্তৃপক্ষও অনুধাবন করতে পারছে। যেসব ব্যাংকে ফরেন রেমিট্যান্স বেশি, সেখানকার গ্রাহকদের প্রবাসী কানেকশনও বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়ে দিয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ মনে করলে সংশ্লিষ্ট শাখা বন্ধ করতে পারবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। ইতিমধ্যে ইসলামী ব্যাংকের পাঁচটি শাখা বন্ধ করা হয়েছে যশোর, ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গা অঞ্চলে। ওই সব ব্যাংকের গ্রাহকদের একটা বড় অংশ অথবা তাদের স্বজনরা প্রবাসী বলে নিশ্চিত করেছেন ব্যাংক কর্মকর্তারা।
একটি ব্যাংকের যশোর শাখায় ক্যাশ বিভাগে কর্মরত একাধিক কর্মকর্তা সুবর্ণভূমিকে বলেছেন, তারা চরম ঝুঁকি অনুভব করছেন। কিন্তু চাকরি করতে হলে এই ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেই কাজ করতে হবে।
তারা বলছেন, সীমিত পরিসরে ব্যাংক চললেও গ্রাহক আসছেন পর্যাপ্ত। ফলে শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করা অসম্ভবপ্রায়। আবার প্রত্যেক গ্রাহকের সঙ্গে নগদ টাকা লেনদেন করতে হচ্ছে। তাদের ভাষায়, বাংলাদেশের মুদ্রা টাকার যে অবস্থা, তাতে হাজারো রোগ-জীবাণু ভরা। বহু হাত ঘুরে বেড়ানো টাকায় করোনাভাইরাস নেই- এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না।
আরেকটি ব্যাংকের কর্মীরা বলছেন, তারা নিরাপত্তার জন্য বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছেন। কিন্তু তা কতটা কার্যকর জানেন না।
এই ব্যাংকের কর্মীদের একাংশ অবশ্য বাড়তি কিছু সুবিধা পাচ্ছেন। তারা পালাক্রমে ডিউটি করছেন। সপ্তাহে তিনদিন যদি একজন কাজ করেন, তো অন্য তিনদিন করেন আরেকজন।
ঢাকার একটি বেসরকারি ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক মাহমুদুর রহমানকে উদ্ধৃত করে বিডিনিউজের খবরে বলা হয়, ব্যাংকে বিভিন্ন জায়গা থেকে লোকজন আসে। তাদের মধ্যে কেউ ভাইরাস বহন করলে সেটা অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে টাকার মাধ্যমেও রোগটি ছড়াতে পারে।
“আমরা তো বুঝতে পারব না কে সংক্রমিত। সব গ্রাহককেই আমাদের সেবা দিতে হচ্ছে। তাতে আমারও সংক্রমিত হওয়ার ভয়ে আছি। ব্যাংক আমাদের জন্য তেমন নিরাপত্তা উপকরণও সরবরাহ করেনি।”
মহামারী ঠেকাতে সরকার গত ২৬ মার্চ থেকে সব ধরনের অফিস আদালত বন্ধ রাখলেও জরুরি সেবার প্রতিষ্ঠানগুলোর পাশাপাশি সীমিত পরিসরে ব্যাংক খোলা রাখার নির্দেশনা দিয়েছে।
এই জরুরি পরিস্থিতিতে লেনদেনের সময়সূচি কমিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি গ্রাহকদের সশরীরে ব্যাংকে আসা নিরুৎসাহিত করতে বলেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
গত ২২ মার্চ সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে ‘কুইক রেসপন্স টিম’ গঠনসহ ১৬ দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে।
ইলেক্ট্রনিক বা মোবাইল ব্যাংকিং বাড়াতে উৎসাহিত করা হলেও তা কতটা কাজে আসছে, এ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। যশোরের একজন সংবাদকর্মী গত দুই সপ্তাহ ধরে নিত্যপণ্য কেনার জন্য বিকাশ বা রকেট অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা ট্রান্সফারের অবিরাম চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু খুচরা বিক্রেতাদের বেশির ভাগেরই বিকাশ, রকেট বা নগদ অ্যাকাউন্ট নেই। বাধ্য হয়ে তাকে ময়লাযুক্ত নগদ টাকা লেনদেন করতে হচ্ছে।
আবার মোবাইলে পণ্যের দাম পরিশোধে সৃষ্টি হয়েছে আরেক বিড়ম্বনা। দোকানপাট খোলার ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করায় বিকাশসহ অন্য মোবাইল পরিষেবাগুলো প্রায় বন্ধ হতে চলেছে। কারণ গ্রাহকরা টাকা রিচার্জ করতে পারছেন না। সব এজেন্টের দোকান বন্ধ।
ব্যাংকাররা বলছেন, অফিস-আদালত, যনবাহন চলাচল বন্ধ থাকলেও মানুষকে লেনদেনের প্রয়োজনে ব্যাংকে যেতে হচ্ছে। সব ধরনের গণপরিবহন বন্ধ থাকায় ব্যাংককর্মীদেরও যাতায়াতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। বিভিন্ন ব্যাংক শাখায় ভিড় করা গ্রাহকরা সামাজিক দূরত্বের নিয়মও ঠিকমতো মানছেন না। তাতে অস্বস্তি বাড়ছে।
গত মঙ্গল থেকে বৃহস্পতিবার বিভিন্ন শাখায় বিস্তর ভিড় লক্ষ্য করা যায়। বেলা ১২টায় ব্যাংকের প্রধান ফটক বন্ধ করে দেওয়ার পরও অনেক গ্রাহককে বাইরে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। তাদের আশা, যদি ভেতরে ঢোকার সুযোগ হয়। কোনো কোনো ব্যাংকের সামনে গ্রাহকদের ভিড় সামলাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও তৎপর হতে দেখা যায়।
এদিকে, গেল বুধবার রাজধানীর মতিঝিলে অগ্রণী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল ব্রাঞ্চের একজন কর্মকর্তার দেহে নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়লে ওই শাখা বন্ধ করে দেওয়া হয়; কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয় ৬৪ কর্মকর্তাকে।
বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের বেতন, সরকারি নানা সুবিধার ভাতাসহ অন্যান্য প্রয়োজনে সরকারি চারটি ব্যাংকে ভিড় বেশি হচ্ছে। মাসের শুরুতে বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংকেও গ্রাহকদের চাপ রয়েছে।
এর মধ্যে গ্রাহকদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বাধ্য করা যাচ্ছে না জানিয়ে অগ্রণী ব্যাংকের কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, প্রয়োজনে ব্যাংকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করতে হবে।
“ব্যাংকের সামনে তারা থাকবেন। একসঙ্গে সর্বোচ্চ দুজনকে ব্যাংকে ঢুকতে দেবেন। দুইজন বের হলে আরো দুজন প্রবেশ করবেন।”
আসাদুজ্জামান বলেন, “অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখতে ব্যাংক চালু রাখতে হবে, সেটা আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই। কিন্তু আমাদের কথা কেউ শোনে না। সোশ্যাল ডিস্ট্যান্স মানছে না, গা ঘেষে দাঁড়াচ্ছে।”
রাজধানীর মতিঝিলের একটি সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা মো. নাসির উদ্দিন জানান, তিনি প্রতিদিন মিরপুর থেকে অফিসে যান। যাত্রাপথে তাকে সব সময় আতঙ্কে থাকতে হয়।
“আমার ব্যক্তিগত গাড়ি নেই, অফিসের গাড়ি বন্ধ। সপ্তাহে দুদিন এক সিনিয়রের গাড়িতে আসি। কিন্তু বাকি দিনগুলোতে রিকশা, অটোরিকশা যা পাই, তাতে যাই। কোথায় কী আছে জানি না, মনে হয় রিকশা বা অটোরিকশা থেকেই বুঝি সংক্রমিত হলাম!  আরেক সমস্যা হলো, যাওয়া আসার পথে অনেক জায়গায় থামিয়ে আইডি কার্ড চেক করে।”
ঢাকার বাইরের বিভিন্ন ব্যাংকের কর্মকর্তারা আছেন আরো ঝামেলায়। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের একটি বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তার বাড়ি নরসিংদীর পলাশে। প্রতিদিন বাড়ি থেকে অফিসে যাওয়া আসা করেন তিনি। কিন্তু যানবাহন বন্ধ থাকায় তাকে পড়তে হয়েছে বিপাকে।
“এখন পাঁচ-ছয় বার রিকশা পাল্টে অফিসে যাই, আসি। দশ টাকার ভাড়া একশ টাকা দিতে হয়। বড় সমস্যা হয় রাস্তার মোড়ে মোড়ে পুলিশ ধরে। রিকশায় লাঠি দিয়ে বাড়ি মারে, রিকশা থেকে নামিয়ে দেয়, রিকশাওয়ালাকেও মারে।
“গত সপ্তাহে আমাদের এক সহকর্মী ঢাকা থেকে এটিএম বুথ ইন্সপেকশনে এসেছিলেন। সব কাগজপত্র দেখানোর পরও ‘অকারণে ঘোরাফেরার’ অভিযোগে পুলিশ তাকে এক হাজার টাকার মামলা দিয়েছে।”
অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম বলেন, গ্রাহকরা যাতে ব্যাংকে সেবা নিতে এসে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার নিয়ম মানেন, তারা সেই চেষ্টা করছেন। কিন্তু অনেক গ্রাহক তা মানতে চান না।
“মঙ্গলবার আমাদের আমিনকোর্ট শাখায় লোকজনের ভিড় সামলাতে পুলিশ ডাকতে হয়েছে। থানা থেকে পুলিশ এসে লাইন ঠিক করেছে। এ অবস্থায় কার্যক্রম চালাতে কী করতে হবে সেটা তো আর আমরা ঠিক করব না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তো এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক যেটা বলবে আমরা সেটাই করব।”
নভেল করোনাভাইরাসের বিস্তার ঠেকাতে গ্রাহকরা ব্যাংকগুলোতে গিয়ে যাতে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখেন, তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংকও প্রয়োজনে প্রশাসনের সহায়তা নিতে বলেছে।
বুধবার রাতে সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের পাঠানো এক সার্কুলারে বলা হয়, “বিভিন্ন ব্যাংকে আগত বিভিন্ন ভাতা গ্রহণকারীসহ গ্রাহক/দর্শনার্থী/সাক্ষাৎপ্রার্থী কর্মকর্তা/কর্মচারীরা ব্যাংকে আগমন করার পর নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখছেন না। তারা যাতে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখেন সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তা গ্রহণ করা যেতে পারে।”

আরও পড়ুন