'কাকে বলি ওগো মৃত্যু থামাও'

আপডেট: 02:50:21 17/09/2017



img

জাফর সোহেল

‘ইতিহাসের নৃশংসতম গণহত্যা চলছে মিয়ানমারের রাখাইনে’- শুরুতে কারো কারো এমন মন্তব্যে অনেকে দ্বিমত পোষণ করলেও গত কয়েকদিন ধরে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের কাছে যেসব নিষ্ঠুর গল্প শোনা যাচ্ছে তাতে রোহিঙ্গা নিধনের বর্বর এ কাহিনীকে গণহত্যার সবচেয়ে নিকৃষ্ট উদাহরণ বলতে আর কেউ দ্বিধা করবেন বলে মনে হয় না।
নতুন করে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বলছেন, সেখানকার সব রোহিঙ্গা যুবকদেরই ধরে নিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। তাদের প্রকাশ্যে পরিবার-পরিজনের সামনেই গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে । এই নিষ্ঠুর তৎপরতা দিনে দিনে আরো তীব্র হয়েছে। এমনকি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমালোচনা শুরুর পর নৃশংসতার মাত্রা আরো বেড়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে নতুন করে আসা রোহিঙ্গাদের কথায়।
সবশেষ শুক্রবার এবং তার কয়েকদিন আগে টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে নাফ নদী বা সমুদ্র পেরিয়ে যারা এসেছে তাদের কয়েকটি কাহিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে এসেছে। সেসব কাহিনি এতই করুণ, এতই নির্মম, এতই রোমহর্ষক যে, গায়ের সবকটি লোম দাঁড়িয়ে যায়। চোখ ভিজে আসে অজান্তেই। ভেতরটা হু হু করে ওঠে অচেনা সেই মানুষগুলোর জন্য। হাজার হোক মানুষ তো!
এ রকম একটি কাহিনি হলো আরাকানের ১৮ দিনের নবজাতকের মা ইয়াসমিনের। রোহিঙ্গা অধ্যুষিত অন্য এলাকাগুলোতে সেনাবাহিনী এবং বৌদ্ধদের নির্বিচারে মানুষ হত্যা এবং বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগের কথা শুনে ইয়াসমিন তার তরুণ স্বামী শোয়েবকে অনেকটা জোর করেই বাংলাদেশের দিকে রওনা দিতে বাধ্য করেন। কিন্তু কে জানতো, এই পথেই ওঁত পেতে আছে শত্রুর বুলেট। শরণার্থী জীবনের দিকে আত্মসমর্পণ করার পরও রেহাই মেলেনি ইয়াসমিনের স্বামীর। কান্না শুকিয়ে যাওয়া গলায় ইয়াসমিন বলেন, ‘সেনারা আমার হাত থেকে তাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যায়। তারপর আমাদের সামনেই গুলি করে রাস্তার পাশে ফেলে দেয়। আমি আমার স্বামীর জন্য একটু কান্নারও সুযোগ পাইনি।’
ইয়াসমিনের বিশ্বাস, বয়সে তরুণ বলেই তার স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে।
এ রকম সব রোহিঙ্গা যুবককেই ধরে ধরে হত্যা করা হচ্ছে সেখানে।
শুক্রবার আসা এক বৃদ্ধ রোহিঙ্গার কাহিনি বার্মিজ সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধদের গণহত্যার নির্মমতার আরেক করুণ উদাহরণ। তিনি জানান, বৌদ্ধ মগরা তার ছয় ছেলের মধ্যে পাঁচজনকেই ধরে নিয়ে গলা কেটে হত্যা করেছে। এরপর তাদের বাড়িতে আগুন দিয়েছে সেনারা। পাড়ার একমাত্র মুদি দোকানটিও তারা জ্বালিয়ে দিয়েছে। বড় ছেলের বয়স (৫৫) বেশি হওয়ায় বেঁচে গেছে এবং তার কাঁধে ভর করেই তিনি বাংলাদেশে এসেছেন। পরিবারের নারী-শিশুদের কে কোথায়, তা এখনো জানেন না তিনি।
বৃহস্পতিবার রাতে একটি বেসরকারি টেলিভিশনে পালিয়ে আসা এক রোহিঙ্গাকে বলতে শুনলাম, তার পরিবার ও প্রতিবেশী ১৮ জন রোহিঙ্গাকে হত্যা করতে তিনি নিজে দেখেছেন। অন্য পাড়াগুলোতেও একই অবস্থার কথা তিনি পথে আসতে আসতে জানতে পেরেছেন।
আরেকটি টেলিভিশনে একজন বলছিলেন, তারা মোট ২৭ জন একসঙ্গে রওনা হয়েছিলেন। বাংলাদেশে যখন তিনি ঢুকেছেন তখন তিনি একা। বাকিদের ভাগ্যে কী ঘটেছে তা তিনি জানেন না।  
নাফ নদীর তীরে আর বঙ্গোপসাগর উপকূলে এখন কেবল এমন কাহিনির ফেরিওয়ালাদের ভিড়। যে কাহিনিগুলো এটাই প্রতিষ্ঠিত করছে যে, আকাশ থেকে কোনো অ্যাঞ্জেল নেমে না এলে আর সভ্য পৃথিবীর কেউ যদি এ মুহূর্তে কোনো পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে রাখাইনের বনে জঙ্গলে বা এখানে সেখানে লুকিয়ে থাকা রোহিঙ্গা যুবকদের ভাগ্যে আসলে মৃত্যু ভিন্ন আর কিছু লেখা নেই।
গত ২০ দিনে অন্তত ২০ হাজার রোহিঙ্গা যুবককে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি বেঁচে যাওয়া স্বজনদের। আরো যত দিন সুযোগ পাবে, মিয়ানমার সেনা আর বৌদ্ধ মগরা সেখানে রোহিঙ্গা যুবকদের মেরে মেরে আগুনে পোড়াবে অথবা মাটিতে পুঁতে ফেলবে। আরাকানের পাহাড়ে পাহাড়ে লুকিয়ে থাকা রোহিঙ্গা যুবকদের এখন কে বাঁচাবে?
বাঁচানো তো পরের কথা, পরিতাপের বিষয় হলো আমরা আর বাকি বিশ্ব বলছি, রোহিঙ্গা যুবকেরা শরণার্থী হচ্ছে না কারণ, তারা হয়তো আরাকান স্যালভেশন আর্মির সঙ্গে জঙ্গি তৎপরতায় যোগ দিচ্ছে। হায়রে আমাদের কল্পনা! আমরা ধরে নিতে পারি, তারা জঙ্গি হয়ে যাচ্ছে; কিন্তু ধরে নিতে পারি না, তাদের হত্যা করা হচ্ছে।
মিয়ানমারকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্র বলার সাহস এখন আক্ষরিক অর্থেই বাংলাদেশসহ অন্য সবাইকে দেখাতে হবে। বাস্তবিক পক্ষে মিয়ানমার সেনাবাহিনী যা করছে তা সন্ত্রাসী বা   রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত অপরাপর রাষ্ট্রগুলোকে হার মানিয়েছে। সেখানে যেভাবে নিরপরাধ মানুষদের হত্যা করা হচ্ছে, যেভাবে তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তাও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মাধ্যমে, তা অতীতে খুব কমই হয়েছে। বিশেষ করে সেখানে যেভাবে শিশুদেরও নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে তা ইতিহাসে বিরল। এমন নিকৃষ্ট ঘটনা যারা ঘটাচ্ছে তাদের সন্ত্রাসী রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণার দাবি তোলা উচিত পৃথিবীর সব সভ্য মানুষের, সব সভ্য জাতির।
এ সন্ত্রাসী কার্যক্রমকে রুখে দাঁড়াতে এবং রোহিঙ্গা যুবকদের নির্বিচারে গণহত্যা বন্ধে এখনই জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। নিয়ম অনুযায়ী তা নিতে পারে জাতিসংঘ। তবে, অনানুষ্ঠানিকভাবে যে কেউ এই অন্যায় প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে পারে। গত শতাব্দীর শেষ দশকে যুগোস্লাভিয়ার স্বৈরশাসক স্লোবেদান মিলেশোভিচের বসনিয়া ও কসভোর মুসলিমদের ওপর চালানো গণহত্যা এভাবেই বন্ধ করা হয়েছিল। সেখানে জাতিসংঘ মিশন প্রেরণ করা হয়েছিল এবং সেফ জোন তৈরি করে গণহত্যার শিকার মানুষদের থাকার জায়গা করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ সামরিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগে কসভো এমনকি স্বাধীনতাও লাভ করে। আর গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত করে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় স্লোবেদান মিলোসেভিচকে।
আমরা কেবল শরণার্থী ব্যবস্থাপনা এবং তাদের ফেরতের বিষয় নিয়ে কথা বলছি। কিন্তু মৃত্যুর যে উৎসব চলছে রাখাইনে তা বন্ধের উপায় সম্পর্কে কিছু বলছি না। তাহলে কে থামাবে এই হত্যাকারীদের? রাখাইনের বনে-জঙ্গলে, বাঁশঝাড়ের আড়ালে, লতা-পাতা খেয়ে এখনো যারা বেঁচে আছে; মৃত্যুভয়ে শুকিয়ে গেছে যাদের প্রাণ, তাদের কে দেবে একটুখানি বাঁচার আশা? একাত্তরের মহান কবি অ্যালেন গিন্সবার্গের ভাষায়-
কার কাছে বলি ভাত-রুটির কথা
কাকে বলি করো, করো করো ত্রাণ
কাকে বলি ওগো মৃত্যু থামাও
মরে যাওয়া বুকে এনে দাও প্রাণ।
[লেখক : সাংবাদিক। এনটিভি থেকে।]

আরও পড়ুন