‘শোনেন, স্যার কিন্তু টাকা খায় খুব’

আপডেট: 01:50:10 15/10/2017



img

আনোয়ার হোসেন, মণিরামপুর (যশোর) : মণিরামপুর মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার ও এক সহকারীর ঘুষ বাণিজ্যের অডিও রেকর্ড ফাঁস হয়ে গেছে।
মাধ্যমিক স্তরের এক শিক্ষিকার 'নাম ও পদবির' ভুল সংশোধনের কথা বলে শিক্ষা অফিসার আকরাম হোসেনের পক্ষে তার অফিস সহকারী জিয়া এই বাণিজ্য করেছেন। আকরাম হোসেন ও জিয়ার চাহিদা মতো টাকা সরবরাহ না দেওয়ায় ওই শিক্ষিকাকে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। এমনকী প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে ইতিমধ্যে ওই শিক্ষিকাকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়ার জন্য বলেছেন আকরাম হোসেন খান। শুক্রবার সকালে শিক্ষিকার স্বামী সুবর্ণভূমিকে বিষয়টি অবহিত করেন।
এই বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে উপজেলা শিক্ষা অফিসার আকরাম হোসেন খান ব্যস্ততার কথা বলে ফোন কেটে দেন। আর ওই অফিসের সহকারী জিয়া টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে রিপোর্ট না করতে অনুরোধ করেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উপজেলার পলাশী বহুমুখী হাইস্কুলের এক সহকারী শিক্ষিকার এমপিওর সময় নামের ইংরেজি বানানে 'টি' অক্ষরের ক্ষেত্রে 'ডি' ও 'সমাজবিজ্ঞান' বিষয়ের পরিবর্তে 'বাংলা' চলে আসে। ২০১২ সালের প্রথম দিকে ওই শিক্ষিকা পলাশী হাইস্কুলে যোগ দেন। ২০১৩ সালের প্রথম দিকে তার এমপিও হয়। উল্লিখিত ত্রুটি সংশোধন করতে সম্প্রতি  উপজেলা শিক্ষা অফিসের সহকারী জিয়ার শরণাপন্ন হন ওই শিক্ষিকা। এই কাজে খরচ আছে এবং অফিসার ঢাকায় আছে বলে ওই শিক্ষিকাকে পরে যোগাযোগ করার জন্য বলেন জিয়া। পরে শিক্ষিকা তার স্বামীর মোবাইল ফোন ব্যবহার করে জিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। জিয়া তাকে বলেন, 'আমি স্যারের সাথে বিষয়টি নিয়ে কথা বলিছি। স্যার আপনার সাথে সরাসরি কথা বলতে চায়। শোনেন, স্যার কিন্তু টাকা খায় খুব। আপনাকে এই ত্রুটি, সেই ত্রুটি দেখিয়ে ১০-২০ হাজার টাকা দাবি করতি পারে। এই কাজতো আসলে কিছু না। অফিস থেকে ফরোয়ার্ডিং দিলেই কাজ হয়ে যাবে। তবুও আপনে খামের মধ্যে দুই হাজার টাকা ঢুকিয়ে নিয়ে অফিসে এসে স্যারের হাতে দিয়েন।'
জিয়ার কথা শুনে দুই-তিন দিন পরে অফিসে এসে শিক্ষা অফিসার আকরাম হোসেনের সঙ্গে কথা বলেন ওই শিক্ষিকা। তখন আকরাম হোসেন নিজের জন্য পাঁচ হাজার এবং জিয়ার জন্য এক হাজার টাকা দাবি করেন। অফিসারের কথা শুনে তখনই তাকে দুই হাজার ও জিয়াকে ৫০০ টাকা দিয়ে চলে আসেন ওই শিক্ষিকা।
সূত্র জানায়, 'নাম ও পদবির ত্রুটি' সংশোধন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা অফিসের কাজ। এই কাজে কোনো খরচ নেই জেনে প্রথম থেকেই অফিসারদের টাকা দিতে ইচ্ছুক ছিলেন না শিক্ষিকার স্বামী দেবাশীষ বিশ্বাস।
শুক্রবার সকালে সুবর্ণভূমিকে দেবাশীষ বিশ্বাস অভিযোগ করে বলেন, 'আমি নিজেও একটা স্কুলের শিক্ষক। বিষয়টি নিয়ে আমি জেলা শিক্ষা অফিসে কথা বলেছি। সেখান থেকে আমাকে জানানো হয়েছে এই কাজে কোনো খরচ লাগে না। কিন্তু আমার স্ত্রী অফিসে গেলে তার কাছে ছয় হাজার টাকা চাওয়া হয়। তিনি আড়াই হাজার দিয়ে এসেছেন। বাকি টাকার জন্য ওই অফিসার ও জিয়া স্কুলের প্রধান শিক্ষক ও কেরানির কাছে বলেছেন। এমনকী শিক্ষা অফিসার আমার স্ত্রীকে কারণ দর্শানোর নোটিস করতে ওই প্রতিষ্ঠানপ্রধান শহিদুল ইসলামকে বলেছেন।'
দেবাশীষ বিশ্বাস বলেন, 'স্কুল খোলার পর আমার স্ত্রী স্কুলে যাওয়ার পর অন্যান্য শিক্ষকদের সামনে হেড মাষ্টার ও কেরানী তাকে বলছেন,শিক্ষা অফিস আপনার কাছে টাকা পাবে,আপনি দিচ্ছেন না কেন?'
এরপর অফিসের জিয়াকে আমি ফোন করে বলেছি, 'যা দেওয়া হয়েছে, সেটা মেনে নেন।' এই কথা বলতেই জিয়া আমাকে বলেছেন, 'আপনে ফোন করার কে? আপনার কথা বলার অধিকার নেই। আপনার স্ত্রীকে কথা বলতে বলেন। এসব বলে ফোন রেখে দেন জিয়া,' অভিযোগ করে বলেন দেবাশীষ বিশ্বাস।
দেবাশীষ বিশ্বাস আরো বলেন, 'পরে একদিন আমার বাবা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক সুনীল দাসকে দিয়ে জিয়ার জন্য ৫০০ টাকা পাঠাই। বাবা অফিসে গিয়ে ৩০০ টাকা দিতে চাইলে গরম হয়ে ওঠেন জিয়া। পরে বাবা তাকে ৫০০ টাকা দিয়ে আসেন।'
এদিকে জিয়ার সঙ্গে কথোপকথনের সব অডিও রেকর্ড সংরক্ষণ করেন শিক্ষক দেবাশীষ। যা শুক্রবার সকালে সুবর্ণভূমিকে সরবরাহ করেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে তিনি দুদকে অভিযোগ করবেন বলে জানিয়েছেন।
পলাশী বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শহিদুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'আমাকে শোকজ করার কথা বলা হয়নি। তবে জিয়া বলেছেন, ম্যাডামের কাছে কিছু টাকা পাবেন। আমি যেন ম্যাডামকে বলি সেগুলো দিয়ে দিতে।'
জানতে চাইলে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের সহকারী জিয়া টাকা নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। বলেন, 'কাজ করে দিলে আমাদের দুই-এক পয়সা সবাই দেয়।'
এই কাজে ওই শিক্ষিকা জিয়াকে ৫০০ ও শিক্ষা কর্মকর্তা আকরাম হোসেন খানকে নিজ হাতে টাকা দিয়েছেন বলেও স্বীকার করেছেন জিয়া।
তবে, বিষয়টি নিয়ে না লিখতে অনুরোধ করেন জিয়া।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওবায়দুর রহমান বলেন, 'বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
এদিকে শিক্ষা অফিসের সহকারী জিয়ার সঙ্গে দুপুরে কথা বলার পর তিনি সংশ্লিষ্ট স্কুলের প্রধান শহিদুল ইসলামকে ফোন করেছেন। এরপর ওই শিক্ষিকাকে ফোন করে শহিদুল ইসলাম নানা কথা বলছেন বলে অভিযোগ উঠছে। ফলে শিক্ষা অফিসের অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তার রোষানলে পড়ার ভয় পাচ্ছেন ওই শিক্ষিকাসহ তার পরিবার।

আরও পড়ুন