অবশেষে সাতক্ষীরার বাকী রাজাকার গ্রেফতার

আপডেট: 11:41:29 19/03/2017



img

আব্দুস সামাদ, সাতক্ষীরা : মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল কর্তৃক গ্রেফতারি পরোয়ানার পলাতক আসামি সাতক্ষীরার কুখ্যাত রাজাকার এম. আবদুল্লাহেল বাকীকে (১০৩) অবশষে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
শনিবার সন্ধ্যায় নিজ বাসভবন সদর উপজেলার আলীপুরের বুলারাটী থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
সাতক্ষীরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফিরোজ হোসেন মোল্লা বাকীকে গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
উল্লেখ্য, শুক্রবার দুপুর ১২.৩০টায় তাকে তার বাড়ি সদর উপজেলার বুলারাটি গ্রামের নিজ বাড়িতে ঘেরাও করে রাখে পুলিশ। বয়স একশো বছরের ঊর্ধ্বে থাকায় পুলিশ তাকে তখনই গ্রেফতার না দেখিয়ে নজরবন্দী করে রাখে।
রাত ১০টার দিকে তাকে সাতক্ষীরা থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে নিয়ে যাওয়া হবে। রোববার সকালে তাকে ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে হাজির করা হবে।
সাতক্ষীরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কেএম আরিফুল হক জানিয়েছিলেন, শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকায় তাকে সতর্কতার সাথে রোববার ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তোলা হবে। তিনি আরও বলেন, এম. আবদুল্লাহেল বাকী মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের গ্রেফতারি পরোয়ানার পলাতক আসামি।
উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল-০১ গত ৮ মার্চ বাকীসহ সাতক্ষীরার তিন রাজাকারের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। অন্যদিকে, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারিকৃত ওই তিন রাজাকারকে অবিলম্বে আটকের দাবিতে গত ১২মার্চ সাতক্ষীরায় মানববন্ধন ও সমাবেশ করে সাতক্ষীরার মুক্তিযোদ্ধা-জনতা। বাকীর বিরুদ্ধে একাত্তরে একাধিক হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে নেতৃত্ব দেয়ার অভিযোগ আছে। বাকী তৎকালীন সাতক্ষীরা মহাকুমার রাজাকার বাহিনীর প্রধান ছিলেন।

বাকীর নৃশংসতার বর্ণনা

মহান মুক্তিযোদ্ধা ইমাম বারী সাতক্ষীরা শহরের কাটিয়ার সন্তান। ১৯৭১ সালে যশোরে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া অবস্থায় যুদ্ধে যোগ দেন। তিনি ছিলেন যুদ্ধকালীন গঠিত বাংলাদেশ নৌ-কমান্ডের প্রথম ব্যাচের যোদ্ধা। তিন মাসের ট্রেনিং শেষে তাদের ৪টি গ্রুপে ভাগ করে মুক্তিযুদ্ধের এক অনন্য সাফল্য ‘অপারেশন জ্যাকপট’র জন্য পাঠানো হয়। মংলায় ৮টি জাহাজ বিস্ফোরক দিয়ে উড়িয়ে দেয়ার পর ইমাম বারী ও তার দল ফিরছিলেন সাতক্ষীরার দিকে। পথিমধ্যে ১৭ আগস্ট  ১৯৭১ ভোররাতে বুধহাটা বেতনা নদীতে তাদের নৌকা ঘিরে ফেলে আলিপুরের কুখ্যাত রাজাকার বাকীর নেতৃত্বাধীন বাহিনী। নদীর দুই পাড় দিয়ে ক্রমান্বয়ে গুলি করতে থাকলে একপর্যায়ে গুলি শেষ হয়ে যায় মুক্তিযোদ্ধাদের। ফলে তাদের আটক করতে সমর্থ হয় রাজাকাররা।
রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা ইমাম বারী ৭১ সালের সেই দুর্বিষহ স্মৃতি তুলে ধরেন এই প্রতিবেদকের কাছে, ‘প্রথমেই আব্দুল্লাহেল বাকী রাজাকার মুক্তিযোদ্ধাদের নৌকায় উঠেই কোনো কথা বলার আগেই তার কাছে থাকা থ্রি নট থ্রি রাইফেল তাক করে সুঠামদেহী মুক্তিযোদ্ধা যশোরের আফতাফকে সরাসরি বুকে গুলি করে। গুলিবিদ্ধ আফতাফ আর্তনাদ করে নদীতে পড়ে ভেসে যায়। শহিদ আফতাফের লাশ আর পাওয়া যায়নি। এরপর আমাদের ৫ জনকে চোখ বেঁধে নদীর পাড়ে একটি একতলা বাড়িতে আটকে রাখে। কয়েক ঘণ্টা ধরে আমাদের উপর নিষ্ঠুর নির্যাতন চলতে থাকে। এরপর পলাশপোলের রোকনুজ্জামান খান এসে আমাদের দলের সিরাজকে দেখে উত্তেজিত হয়ে উঠে। সে সিরাজকে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে গিয়ে বেড়িবাঁধের ওপর দাঁড় করিয়ে রাইফেল দিয়ে বুকে গুলি করে। শহীদ হলেন সিরাজ।’
এরপর রোকন একটি লাঠি দিয়ে আমার মাথায় বাড়ি মেরে বলল তুইও আছিস এই দলে, আগে জানলে তো তোকেই মেরে ফেলতাম। এরপর কীভাবে যেন সাতক্ষীরায় পাকিস্তানি মিলিটারির কাছে খবর যায় আমাদের আটক হওয়ার। ফলে আমাদের একটি হলুদ রঙের গাড়িতে করে সাতক্ষীরা ডায়মন্ড হোটেলের টর্চার সেলে এনে আটকে রাখা হয়। পথিমধ্যে ধূলিহর থেকেও কয়েকজনকে তুলে আনা হয়। ডায়মন্ড (স্টার হোটেলও বলা হতো) হোটেলে আমাদের পিলারের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। অনেককে ঘরে ঝুলানো হুকের সঙ্গে ঝুলিয়ে নির্যাতন করা হতো। এই হোটেলের অনেকগুলো রুমে অসংখ্য যুবতী মেয়েকেও আটকে রাখা হয়েছিল। যাদের নিয়মিত ধর্ষণ করত পাকিস্তানি সৈন্য ও রাজাকাররা।
তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের আটকে রাখাকালে একদিন খালেক মণ্ডল ও টিক্কা (জহুরুল) এসে কয়েকজন আটক মুক্তিযোদ্ধাকে তুলে নিয়ে যায়। অন্য রাজাকাররা জানায়, তাদের বিনেরপোতায় হত্যা করা হবে। এরপর একদিন আমাদের যশোরে পাকিস্তানি বাহিনীর আস্তানায় পাঠানো হয়। যশোরের শংকরপুর যেখানে বর্তমানে বাসস্ট্যান্ড, সেখানে আটকে রাখা হয়। সেখান থেকে একদিন ভোর বেলা যখন সৈনিকেরা প্যারেড করছিল তখন আমরা পালিয়ে আসি এবং পুনরায় যুদ্ধে যোগ দেই। সে আরেক ইতিহাস।’
এছাড়াও বাকীর অসংখ্য নৃশংসতার প্রমাণ মিলেছে মামলার তদন্তকালে। এই কুখ্যাত রাজাকার শিরোমণির গ্রেফতার হওয়ায় এখন তার ফাঁসির রায়ের জন্য প্রহর গুণছে সাতক্ষীরার অসংখ্য শহীদ পরিবার ও নির্যাতিত মুক্তযোদ্ধারা।

আরও পড়ুন