অনুপ সাহার গল্প : কালান্তিক

আপডেট: 09:37:01 21/04/2017



img

নবীন সেনের পরিবারে এক নতুন বিপত্তি উপস্থিত হয়েছে। তার বড় ছেলের ভেতর একটা বিরাট পরিবর্তন দেখা গেছে। এই পরিবর্তনের ব্যাখ্যা কেউ দিতে পারছে না। নবীন সেনের বোনের ছেলে সক্রেটিস যে কিনা জিন বিদ্যায় পিএইচডি করেছে এবং এই জ্ঞানের উপর বিশেষজ্ঞ হয়েছে সেও তার বিজ্ঞানের সমস্ত যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারছে না। তার যে জ্ঞান সেই জ্ঞানের ভেতর ফেলে কোনো বিশ্লেষণ তার পক্ষে করা সম্ভব না, কিন্তু নবীন সেনের বড় ছেলের এই পরিবর্তন জিনগত না কালান্তিক তা বোঝা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেশ কিছু ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে তার এই পরিবর্তনকে নিয়ে। শুয়োপোকার প্রজাপতিতে রূপান্তর মানুষ জাতি প্রত্যক্ষ করেছে কিন্তু প্রজাপতি শুয়োপোকাতে রূপান্তরিত হয়েছে এমন কথা বা এমন রূপান্তর ভূ-ভারতে তো দূরের কথা সারা পৃথিবীতে কেউ কখনো দেখেছে কিনা তার উদাহরণ আগে কেউ দিতে পারেনি আর এখন তো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু নবীন সেনের বড় ছেলে পরমার্থর এই পরিবর্তন একটা বিস্ময়ের বস্তু। বিষয়টা এরকম।
একদিন সকালে পরমার্থ ঘুম থেকে উঠে ভিন্ন স্বরে ডাকতে শুরু করে। সে যে ভাষায় এবং যে স্বরে কথা বলে তা যেন অন্য কোনো মানুষের। পরমার্থর কণ্ঠ শুনে নবীন খানিকটা অবাক হয়ে ঘরের ভেতর প্রবেশ করে দেখে তার ছেলে উঠে বসে আছে। তাকে দেখে নবীন সেন ঘরে ঢুকে কথা না বলে বের হয়ে যান। যিনি নতুন এসেছেন তিনি এ রকম আচরণ দেখে খানিকটা ক্ষোভ নিয়ে বলেন,
‘তোমাকেই ডেকেছি। কথা না শুনে চলে যাচ্ছ কেন?’
নবীন তার ছেলে পরমার্থর কণ্ঠে নতুন কণ্ঠস্বর শুনে আবার ফিরে যান। নতুন মানুষটা এখন তার পূর্ণরূপ ধারণ করেন। তিনি বলতে শুরু করেন,
‘আমি হচ্ছি তোমাদের অষ্টাদশ ঊর্ধ্বগামী পূর্ব-পুরুষ। আমার নাম জলধর সেন। তুমি বুঝতেই পারছো আমি কত পুরনো মানুষ। তোমাদের চিনবার বা জানবার কথা নয়; এমনকী তোমার বাবা বা তার বাবারও জানবার বিষয় নয়। আমি এতটা পুরনো যে তোমার বংশতালিকার ভেতর থাকবার কথা নয়। যদি বংশতালিকা থেকে থাকে তাহলে আমার নাম লেখা থাকতে হয়তো পারে।’
 
নবীন বুঝতে পারছেন না সত্য সত্যই সে অষ্টাদশ ঊর্ধ্বগামী পূর্বপুরুষ কিনা। বংশতালিকা একটা হয়তো বাড়িতে আছে কিন্তু অষ্টাদশ পুরুষ পর্যন্ত আছে কিনা তার জানা নেই। সপ্তম পুরুষ অবধি তার জানা আছে কিন্তু অষ্টম পুরুষ সম্পর্কে তিনি ওয়াকেবহাল নন এবং তার পিতা এ ব্যাপারে তাকে কখনো জানাননি। নতুন মানুষটা জিজ্ঞেস করে,
‘তোমার নাম কী?’
‘আমার নাম নবীন সেন।’
‘আমি আমার অধস্তন পুরুষদের চিনি না। তাই তাদের দেখতে এই পৃথিবীতে নেমে এলাম। তোমাদের কেমন লাগবে জানি না তবে আমার বেশ ভালোই লাগছে।’
 
তার কথা শুনে নবীন সেনের বিস্ময়ের অবধি থাকে না। কী বলবেন বুঝতে পারেন না। এই অষ্টাদশ পুরুষ কত বছর গত হয়েছেন বা পৃথিবীতে কখন ছিলেন তা জানেন না কিন্তু ছেলে পরমার্থর কণ্ঠে নতুন মানুষের কথা শুনে ভাবতে পারছেন না কী করবেন আর কী করবেন না। বিস্ময়ের শেষ থাকে না। ছেলে পরমার্থর চেহারায় একটা পরিবর্তন এসেছে, বার্ধক্যের একটা ছাপ দেখা যাচ্ছে, তার যৌবনের কমনীয়তা যেন হারিয়ে গেছে। এই পরিবর্তন ও নতুন মানুষের আগমন তাকে এক বিরাট বিস্ময়ের ভেতর পতিত করেছে যার ব্যাখ্যা তিনি কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছেন না। সক্রেটিসও তার শিক্ষকদের সাথে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করেছেন কিন্তু কেউই উত্তর দিতে পারছেন না।
অষ্টাদশ পুরুষ নবীনকে বললেন, ‘আমি তোমাদের সকলের সাথে একটু পরিচিত হতে চাই। তুমি কি সকলকে হাজির করতে পারবে?’
‘পারবো, তবে সময় লাগবে।’
‘লাগুক, আমার কোনো তাড়া নেই।’
নবীন ঘর থেকে বেরিয়ে বাড়ির ভেতর গিয়ে হাজির হন। সকলকে বলেন,
‘তোমরা সবাই পরমার্থর ঘরে গিয়ে উপস্থিত হও।’
‘কেন?’
‘পরিচিত হতে হবে।’
‘কার সাথে পরিচিত হতে হবে?’
‘আমাদের অষ্টাদশ পূর্বপুরুষ জলধর সেনের সাথে।’
‘কী সেন আর কী পুরুষ!’
‘জলধর সেন, অষ্টাদশ পূর্বপুরুষ।’
‘সে আবার কে? বাবার জন্মেও তো কখনো শুনিনি এমন কোনো পুরুষের নাম।’
মেয়ে তন্বী বললো, ‘বাবা আমার ফিজিওলজি পরীক্ষা, আমি যেতে পারবো না। যদি ফেল মারি তো এক বছরের ধাক্কা।’ ডাক্তারি পড়া মেয়ে তার অপরাগতার কথা বলে।
‘তো এই পুরুষ কীভাবে এলেন?’
‘বোধহয় কালান্তিকের মাধ্যমে।’
‘কীসের মাধমে?’
‘কালান্তিকের মাধ্যমে।’
‘সেটা আবার কী?’
‘সেটাই তো আমি বুঝতে পারছি না। এই অষ্টাদশ মহাপুরুষ কীভাবে এলেন এবং কীজন্য এলেন।’
‘ওর সাথে আমাদের সকলের দেখা করা কি খুব প্রয়োজন?’
‘উনি সেটা চাইছেন। তবে একটা কথা তোমাদের সকলকে বলি, উনি পরমার্থর দেহে ভর করেছেন। পরমার্থর মুখ দিয়ে তার নিজের স্বরে এবং নিজের ভাষায় কথা কইছেন। পরমার্থর শরীরটাও মনে হচ্ছে কিছুটা পরিবর্তিত হয়ে বার্ধক্যের দিকে ঝুঁকে যাচ্ছে।’
‘মানে? পরমার্থর উপর তিনি ভর করেছেন?’
‘বিষয়টা সেরকমই।’
সকলে পরমার্থর ঘরে গিয়ে উপস্থিত। দেখে পরমার্থ একজন গাম্ভীর্যপূর্ণ ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছে এবং সেই মানুষের মতো বসে আছে। পরমার্থকে কেউ এমন গুরুত্বপূর্ণ মানুষের মতো কখনো বসে থাকতে দেখেনি। সকলে ঘরের ভেতর দাঁড়াতেই অষ্টাদশ পুরুষ বলতে শুরু করলেন। কণ্ঠস্বর অতি গভীর এবং প্রজ্ঞাবান মানুষের মতো। সকলে যেতেই তিনি বলতে শুরু করলেন, ‘তোমরা সকলে আমার ডাকে সাড়া দেওয়ায় ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমার আগমনে তোমরা হয়তো একটু বিস্মিত হয়েছো এবং নানা কিছু ভাবছো। কিন্তু আমি বলি এটা ভাববার মতো কোনো বিষয় নয়। সকলে স্বাভাবিক হলে ভালো হয়।’
তার কথায় সকলে একটু সহজ হবার চেষ্টা করে। এরপর সকলে তাদের পরিচয় দিতে শুরু করে। সকলের পরিচয় শেষ হলে নবীন সেন বলেন, ‘সম্মানিত অষ্টাদশ পুরুষ, আমরা দুজন ব্যক্তির সাথে আপনার পরিচয় করিয়ে দিতে অসামর্থ হচ্ছি।’
‘কেন?’
‘তাদের একজন পরমার্থ যার দেহে আপনি ভর করেছেন এবং আর একজন আমার দ্বিতীয় পুত্র অমীয়কান্ত যে আমেরিকায় পড়াশুনা করছে।’
‘কী নাম বললে? অমীয় কান্ত?’
‘হ্যাঁ মহাশয়।’
‘তোমার ছেলে কি নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিতে পড়ে?’
‘হ্যাঁ।’
‘তার সাথে আমার নিউইয়র্ক ইউনিভার্সির রাস্তায় পরিচয় হয়েছিল। তুমি যে নাম বললে সেও সেই নাম বলেছিল। আমি তখন ইউনিভার্সিটির পথ দিয়েই যাচ্ছিলাম। একটা ছেলে দেখে দাঁড়িয়ে পড়লাম। ছেলেটিকে বাঙালি বলে মনে হলো। তার সাথে কথা বলতেই সে তার নাম বলল অমীয়কান্ত সেন এবং আমার মনে হয়েছিল আমাদের বংশধর কেউ হবে। এখন তোমার কথা শুনে তার যথার্থতা প্রমাণিত হলো।’
একথা শুনে সকলে একে অপরের সাথে চোখে চোখ বিনিময় করে এবং অমীয়ের সাথে দেখা হবার কাহিনি শুনে সকলে বিস্মিত হয়ে যায়।
পরিচয় পর্ব শেষ হলে তিনি বলতে শুরু করেন, ‘আমি হচ্ছি তোমাদের বংশের অষ্টম পুরুষ। আমার পিতা ছিলেন জায়গীর সেন। তার ছিল চার পুত্র। তার ভেতর আমি দ্বিতীয়।’
তার কথা শেষ হলে নবীনের স্ত্রী সুমিত্রা বললেন, ‘মাননীয় অষ্টাদশ পুরুষ, আপনি আপনার সময় সম্পর্কে কি একটু বলবেন?’
‘আমার বাবা ছিলেন নামকরা কবি। তিনি অত্র অঞ্চলের একমাত্র এবং স্বনামধন্য কবি। আমরা সকলে তার কবিত্বে মুগ্ধ হতাম। তিনিই আমাদের পরিবারের এবং বোধহয় এই বংশের প্রথম কবি। তোমাদের ভেতর কেউ কবিতা লেখে?’
কবিতার কথা শুনে সকলে একটু থমকে যায়। নবীন, সুমিত্রা এবং ডাক্তারি পড়া মেয়ে তন্বী পরস্পর পরস্পরের দিকে তাকিয়ে নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে।
নবীন খুব দুর্বল কণ্ঠে বলেন, ‘আমরা কেউ এখন কবিত্ব করি না। আমার পিতা বা পিতামহ যতদূর জানি তারাও কবি ছিলেন না।’
‘সেক্ষেত্রে আমার পিতা জায়গীর সেনই এই বংশের এখনো পর্যন্ত একমাত্র এবং শেষ কবি। আচ্ছা তোমরা কে কী করছ?’
নবীন একটু সাহস নিয়ে বললেন, যেহেতু তিনি সরকারি চাকরি করেন, ‘আমি সরকারি চাকরি করি। খাদ্য বিভাগে।’
‘সেখানে তুমি কি খাদ্য উৎপাদন কর না গুদামরক্ষক?’
‘আমি খাদ্য বিভাগের ইনসপেক্টর।’
‘তার মানে তুমি খাদ্য বিভাগের একজন নিম্নবর্গীয় চাকুরে।’
‘আমার বংশের কেউ এত নিম্ন মানের পদে কাজ করেনি। আমার বাবা ছিলেন রাজকবি এবং আমি রাজার অর্থ বিভাগের প্রধান পরামর্শক বা তোমাদের বর্তমান মন্ত্রিসভার অর্থমন্ত্রী। আমার সময় কেউ খাদ্যাভাবে বা অর্থকষ্টে মারা গেছেন এমন কোনো নজির নেই। আমার সময় মানুষ অত্যন্ত শান্তিতে ছিল এবং বিভিন্ন জায়গা থেকে আমাদের রাজ্য পরিদর্শনে আসতো। আমাকে মানুষ শান্তির দূত হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল। তোমাদের সময়ে জীবনযাত্রা অনেক সহজতর হয়েছে কিন্তু মানুষের প্রতি মানুষের মমত্ব কি বেড়েছে বা মানুষ কি এখন আনন্দ আর উৎফুল্লতায় মেতে থাকে নাকি জীবন-জীবিকার জন্য সবকিছু জলাঞ্জলি দিয়ে বসেছে?’
নবীন নিজেই জানেন তার বর্তমান পদমর্যাদা এবং বাজারে গেলে সকলেই কিছু টাকা উৎকোচ হিসেবে দিয়ে দেয়। সে ক্ষেত্রে নজরদারির বিষয়টি উপেক্ষিত হয়। নবীন এগুতে পারলেন না। সুমিত্রা একটি স্কুলের শিক্ষিকা। তিনি সারাক্ষণ কোচিং বাণিজ্যে ব্যস্ত থাকেন। সেখানে তার এগুনোর পথ বন্ধ হয়ে গেছে। থাকার মধ্যে একমাত্র তন্বী।
‘দেখুন শ্রদ্ধেয় অষ্টাদশ পুরুষ বর্তমান সময় হচ্ছে প্রতিযোগিতার এবং করপোরেট যুগ। এ সময় এ সমস্ত নান্দনিক বিষয় ভাববার সময় নেই। আমরা কোনো সাহিত্য-সংস্কৃতির সাথে জড়িত নই আর থাকার সেই সুযোগও নেই।’
‘তোমার জীবনের উদ্দেশ্য কী?’
‘চিকিৎসা শাস্ত্রের মাধ্যমে মানুষকে সেবা দেওয়া,’ তন্বী জোর দিয়ে বললো।
‘বেশ। খুব ভালো কথা। আমার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা অচীন সেন নগরের বৈদ্য ছিলেন এবং নামকরা। তার চিকিৎসায় উপকার পাননি এমন কোনো রোগী ছিলেন না। কিন্তু অর্থের মোহ তাকে কখনো পেয়ে বসেনি, বিনা মূল্যে সেবা প্রদান করতেন। তোমার আদর্শ কি সেরূপ?’
একথা বলার পর তন্বী থমকে যায়। তার জীবনের উদ্দেশ্য সে জানে ডাক্তারি পাশ করার পর চিকিৎসা বাণিজ্যে নিয়োজিত হবে এবং প্রচুর অর্থ উপার্জন করবে।
তন্বী কথা আর না বাড়িয়ে চুপ করে যায়। অষ্টাদশ পুরুষ কী বলবেন আর কী বলবেন না তার ভয়ে চুপ করে আছে।
অষ্টম পুরুষ বলতে থাকেন, ‘আমি চারিদিকে ঘুরে দেখলাম। তোমরা যেখানে অবস্থান করছো তার চারিদিক। এ সমস্ত দেখবার ফলে আমার একটা ধারণা হয়েছে। তা হচ্ছে সততা আর নৈতিকতার জায়গাটা তোমরা ক্রমশ হারিয়ে ফেলছো। বাহ্যিক বিষয়ের উপর তোমাদের সবিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে, অন্তরের সৌন্দর্যকে তোমরা লালন করতে ব্যর্থ হয়েছো যা একটা সমাজকে শক্তিশালী না করে দুর্বল করে দেয়।’
‘এখন তো উন্মুক্ত অর্থনীতির যুগ। টাকা এখন সকল কিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে।’
‘টাকা হচ্ছে এমন কিছু যা দিয়ে অনেক কিছু হয় আবার কিছুই হয় না। আমাদের সময়ে যে অর্থ বা সম্পদের প্রভাব ছিল না তা নয়, তার প্রভাব তো সৃষ্টির আদিকাল থেকেই ছিল। সেটি বিষয় নয়। সেই অর্থ কী কাজে ব্যয় হচ্ছে, মানুষের মঙ্গল করার কাজে ব্যয় হচ্ছে না মানুষ মারার জন্য ব্যয় হচ্ছে সেটিই বিষয়।’
‘মানুষ এখন অতটা সমাজ নিয়ে চিন্তা করে না। ব্যক্তিতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা।’
‘সেটা তো আমেরিকাতেও দেখলাম এবং এখানেও দেখলাম। আমাদের সময়ে নতুন নতুন আবিষ্কার দিয়ে পৃথিবীকে ভরিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা আবিষ্কারের চমৎকারিত্বে অভিভূত হতাম। তোমাদের সময়ে তেমন কিছু কি আবিষ্কার হয়েছে যা পৃথিবীর মানুষকে উপকৃত করছে?’
নবীন কী বলবেন তা ভেবে না পেয়ে মাথা চুলকাতে থাকেন। এই সময় তন্বী বলে বসে, ‘আমাদের সময়ে দারুণ একটা জিনিস আবিষ্কৃত হয়েছে।’
‘সেটা কী?’
‘আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা।’
‘সেটা কী রকম!’
‘মোবাইল ফোন এবং ইন্টারনেট। এক লহমায় পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যোগাযোগ করা যায়। মানুষকে খুব কাছাকাছি এনে ফেলেছে।’
‘এ প্রযুক্তি আগেও ছিল। তাকে একটু উন্নত করে নতুন ফর্মে আনা হয়েছে। নতুন কিছু হয়নি বা হচ্ছে না।’
নবীন খুব ভয়ে ভয়ে আছে কী বলতে কী বলে ফেলেন। চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন। তার এই কাচুমাচু ভাব দেখে জলধর সেন বলে ওঠেন, ‘অতটা ভয় পাবার কিছু নেই। যে পৃথিবীতে এসে আমি নামলাম তার সাথে আমাদের সময়ের পৃথিবীর মিল নেই। আমি খানিকটা অতৃপ্তি নিয়ে ফিরে গেলাম। একটি সৃষ্টিহীন পৃথিবী। বাইরের চাকচিক্য বেড়েছে কিন্তু অন্তরের মূল্যায়ন হয়নি, সেটি সর্বত্রই উপেক্ষিত।’
‘বর্তমান সমাজ ব্যবস্থা বাইরের জিনিসকেই মূল্য দেয় বেশি। অন্তর নিয়ে কেউ ভাবে না।’
‘আমি যে জন্য পৃথিবীতে এসেছিলাম সে মূল্যায়ন হয়ে গেছে। তোমাদের পৃথিবী এখন সংঘাত আর দ্বন্দ্বের। মানুষ মানুষকেই সব থেকে অবমূল্যায়ন করছে। তাই আমি এ জগৎ ছেড়ে চলে যাচ্ছি। তোমাদের অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু আসল জায়গাতে ফাঁকি পড়ে গেছে। আমি আধঘণ্টা পর তোমার ছেলে পরমার্থকে ছেড়ে চলে যাব।’
‘শ্রদ্ধেয় অষ্টাদশ পুরুষ, আপনি আমাদের আশীর্বাদ দান করুন যাতে করে আমরা সুখে শান্তিতে বাস করতে পারি।’
‘আমি আবারো আসবো যখন তোমরা বড় হবে। বাহ্যিকতাকে ছেড়ে অন্তরের বিষয়কে আলোকিত করবে। অন্ধকার নয় আলোর পৃথিবী দেখতে চাই।’
আধঘণ্টা পরে পরমার্থকে তার স্বরূপে দেখতে পাওয়া গেল।