আজও ন্যায় বিচারের আশায় বাঘারপাড়ার কিশোরী মা

আপডেট: 12:47:06 14/05/2017



img
img

চন্দন দাস : একজন নারী যখন মা হন তখন তিনি স্বর্গীয় এক সুখানুভূতি অনুভব করেন। মা হতে গিয়ে দীর্ঘ ৯ মাস ও প্রসবের যে কষ্ট পান তা মূহুর্তেই ভুলে যান। কিন্তু এমন মা ও আছেন যারা সন্তান ভূমিষ্টের পর নতুন সব কষ্ঠের সম্মুক্ষিণ হন। সামাজিকতার কারণে হয়ে যান একঘরে। ন্যায় বিচার তো পান না বরং অপরের সাজা ভোগে দিন অতিবাহিত করতে হয় তাদের। তবু সন্তানের মুখ পানে সব কষ্ট হজম করেন। তেমনি এক মা ও তার শিশু সন্তানের গল্প জানাবো আজ মা দিবসে। যিনি শত বাধা বিপত্তির পরও ন্যায় বিচারের আশায় বুক বেধে আছেন। তিনি মনে করেন আদালত নিশ্চয় তাকে ন্যায় বিচার দেবেন।
সীমা নামের এ মায়ের নিবাস যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার দোহাকুলা গ্রামে। তার বাবা দিনমজুর। ২০১২ সালের কথা। তখন সে নানার বাড়ি দরিজাফরপুর থেকে লেখাপড়া করত। ব্র্যাক পরিচালিত স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী ছিল সে। ১৩ বছরের এ মেয়েটির উপর নজর পড়ে আগড়া গ্রামের জোহর আলী মোল্লার ছেলে একলাচের। একপর্যায়ে তারা প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। ঘটনা যখন জানাজানি হয় ওই কিশোরী তখন অন্তঃসত্ত্বা। এ নিয়ে শালিস মীমাংশায় বসেন স্থানীয়রা।
একলাচ বিয়ে করতে রাজি হলেও বিপক্ষে অবস্থান নেয় তার বোন ডলি ও ভাই এরশাদ। তারা শর্ত জুড়ে দেয় গর্ভের বাচ্চা নষ্ট করলেই তারা বিয়েতে রাজি হবে। এ শর্তে কিশোরী ও তার পরিবার রাজি হয়নি। যে কারণে শালিস বৈঠক ভেস্তে যায়। পরবর্তীতে ওই কিশোরীর বাবা বাদী হয়ে বাঘারপাড়া থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে একটি মামলা করেন। মামলা নং ৯। তারিখ ১৩/০৭/১২।
মামলায় আসামি করা হয় একলাচ ও তার ভাই এরশাদ আলী ও বোন ডলি খাতুনকে। মামলার বাদী এজাহারে উল্লেখ করেন ২০১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তার মেয়েকে বিয়ের প্রলোভনে ফুসলিয়ে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক ধর্ষণ করে এখলাচ। এরপর এখলাচ তার মেয়েকে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে ধর্ষণ করত। লোক লজ্জায় তার মেয়ে কাউকে বলতে পারেনি। মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়লে বিষয়টি লোক জানাজানি হয়।
মামলার পর আসামিরা মেয়েটির পিতাকে অনেকবার জীবন নাশের হুমকি দিয়েছে। হুমকি দেয়ার ঘটনায় বাঘারপাড়া থানায় সাধারণ ডায়েরি হয়েছে তিনবার। এর মধ্যে পালিয়ে বিদেশে পাড়ি জমায় একলাচ।
এরই মধ্যে ২০১৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর একটি ছেলে সন্তানের জন্ম দেয় কিশোরী মেয়েটি। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে যে দুঃখ কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তা মনে করে কিশোরী মা সন্তানের নাম দেন দুখু মিয়া। তার বয়স এখন সাড়ে তিন বছর।
দুখুর মিয়ার দুখিনি মা আজও বলেন, আমি কেবল স্ত্রী হিসেবে ও সন্তানের পিতার স্বীকৃতি চেয়েছিলাম। কিন্তু সেটা আমাকে দেয়া হয়নি। মামলা করায় সমাজপতিরা একঘরে করেছিল। কিন্তু স্বল্প সময়ের ব্যবধানে তা প্রত্যাহার করে নেয়। এরপর কাজ করে সন্তানের জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করেছি। কিন্তু এক মাস আগে কাজটিও হাতছাড়া হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ‘আমি টাকা পয়সা কিছু চাইনে। আমি চাই সন্তানের পিতৃ পরিচয়’। এটুকু বলেই কাঁন্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি।
দুখিনি এ মা বলেন, এখন পথ চেয়ে আছি ন্যায় বিচারের জন্য। কিন্তু বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতায় হতাশ। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আব্দুস সাত্তারকে আদালত বারবার হাজিরের নির্দেশ দিলেও তিনি অনুপস্থিত থাকেন। যে কারণে বিচারের বদলে কেবল তারিখ পাচ্ছেন। আগামী ২০ জুলাই পরবর্তী দিন ধার্য রয়েছে শুনানীর জন্য।
তিনি বলেন, শত বাধা বিপত্তির পরও ন্যায় বিচারের আশায় বুক বেধে আছি। আদালত নিশ্চয় আমাকে ন্যায় বিচার দেবেন।
প্রসঙ্গত, মামলাটি বর্তমানে যশোর নারী ও শিশু নির্যাতন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। আর এ মামলার অন্যতম আসামি একলাচ পালাতক রয়েছে। অপর দুই আসামি রয়েছে জামিনে।

আরও পড়ুন