ছেলে অন্ধ বৃদ্ধা মা ভিখারি, তবু জোটেনি ভাতা

আপডেট: 02:32:00 22/02/2018



img

আনোয়ার হোসেন, মণিরামপুর (যশোর) : হিমেলা খাতুন (৮০)। ভিক্ষা করে সংসার চালান চল্লিশ বছর। স্বামী মোলাম সরদার মারা গেছেন প্রায় বিশ বছর আগে।
কৃষক স্বামীর আয়ে চার ছেলে ও এক মেয়ের সংসার ভালোমতো চলতো না বলে স্বামী জীবিত থাকতেই অন্যের কাছে হাত পাততেন হিমেলা। একে একে চার ছেলের বিয়ে হয়। বড় ছেলে নওশের আলী (৬০) বসুন্দিয়া এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে থাকেন। স্বামীর মৃত্যুর পরপরই মেজ ছেলে শহর আলী ও সেজ ছেলে মুক্তার আলী মারা গেছেন অসুস্থ হয়ে। মেয়ে রোকেয়াকে বিয়ে দিয়েছেন মণিরামপুরের খানপুর এলাকায়। কোলে ছিল ছোট ছেলে আব্দুল মান্নান (৪৫)।
আব্দুল মান্নান অন্ধ হয়েছেন প্রায় আট বছর আগে। চোখে যখন দেখতেন, তখন ট্রাক চালিয়ে সংসার চলত তার। স্ত্রী, মা ও দুই ছেলেকে নিয়ে কেটে যাচ্ছিল তার। হঠাৎ একদিন ট্রাকের ব্যাটারির কাজ করতে গিয়ে ওপর থেকে ময়লা পড়ে তার চোখে। লক্ষাধিক টাকা খরচ করে ডাক্তার দেখিয়েছিলেন। চিকিৎসা নিতে গেছেন ভারতেও। কিন্তু দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাননি।
মণিরামপুর শহরের বিজয়রামপুর এলাকার বাসিন্দা এই আব্দুল মান্নান।
আব্দুল মান্নানের দুই ছেলে তুহিন (২৩) ও সোহেল (২১) সংসার পেতেছেন। অন্যের আলমসাধু চালিয়ে দিন চলে তাদের। বাবা-মায়ের খোঁজ তেমন রাখেন না তারা।
হিমেলা যখন পূর্ণ যুবতী তখন থেকেই সন্তানদের আহার যোগাতে অন্যের কাছে হাত পাততে বাড়ি থেকে বের হন তিনি। সন্তানরা অসচ্ছল হওয়ায় স্বামীর মৃত্যুর পরও তিনি ভিক্ষা করে আসছেন। ভিক্ষা করে কোনো রকম চলে যেত তার। এরপর অন্ধ ছেলের সংসারের বোঝা চাপে বৃদ্ধা হিমেলার ওপর। এখন ভিক্ষা করে নিজের ও ছেলের আহার যোগান তিনি।
'ভিখারিমুক্ত' মণিরামপুরের বৃদ্ধা হিমেলা সপ্তাহে তিন দিন ভিক্ষা করতে বের হন। সকাল হলে ভিক্ষার থালা হাতে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন। ফেরেন বিকেলে।
হিমেলা ভিক্ষার টাকা দিয়ে ছাগল কিনেছেন পাঁচটি। সপ্তাহের যে চার দিন বাড়ি থাকেন সেই দিনগুলোতে সকালে অন্ধ ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে ছাগল চরাতে মাঠে চলে যান তিনি। সন্ধার আগে আবার ছেলের হাত ধরে বাড়ি ফেরেন।
বুধবার বিকেলে হিমেলার বাড়িতে গিয়ে জানা যায়, অন্ধ ছেলে আব্দুল মান্নানকে নিয়ে ছাগল চরাতে তিনি মাঠে গেছেন। খবর দেওয়া হয় তাকে। বাড়িতে গণমাধ্যম কর্মীর উপস্থিতির কথা শুনে দ্রুত ছেলেকে নিয়ে বাড়ি ফেরেন তিনি। ততক্ষণে সন্ধ্যা নামে। কথা হয় হিমেলা ও তার অন্ধ ছেলে আব্দুল মান্নানের সঙ্গে।
মান্নান বলেন, ‘আগে ট্রাক চালাতাম। ট্রাকের নিচে ব্যাটারির কাজ করতে গিয়ে চোখে ময়লা পড়ে অন্ধ হয়েছি আট বছর। দুই চোখে কিছুই দেখতে পাইনে। মার কয়টা ছাগল আছে, সেগুলো নিয়ে সকালে মার সাথে মাঠে চলে যাই। যেদিন মা বাইরে যায় সেদিন বাড়িতে থাকি। বাবা বেঁচে থাকতেই আমাদের পেট চালাতে মা ভিক্ষা করতো, এখনো করে। আমার স্ত্রী মমতাজ বাড়ির পাশে একটা ভাটায় কাজ করে। মার ভিক্ষার টাকায় আর স্ত্রীর আয়ে কোনো রকম সংসার চলে। আমাদের খবর কেউ নেয় না।’
বৃদ্ধা হিমেলা বলেন, ‘বয়স হয়েছে। প্রতিদিন হেঁটে পারিনে। মঙ্গল, বুধ ও শুক্কুরবারে বের হই। শুক্কুরবারে কিছু টাকা বেশি পাওয়া যায়।’
‘এলাকার কাউন্সিলর জমসেদ আলীর কাছে অনেক বার গিয়েছি। এই পর্যন্ত সে কোনো খবর নিইনি। কত লোকে কত কিছু পায়, আমরা কিছু পাইনে,’ আক্ষেপ করেন হিমেলা।
প্রতিবেশী আবুল হোসেন বলেন, ‘ভোটের সময় কত লোকে আসে, কত কিছু দেয়ার কথা বলে। ভোট চলে গেলে আর খবর নেয় না। এদের ব্যাপারে অনেককে বলেছি। কাউকে কিছু দিতে দেখলাম না।’
স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর জমশেদ আলী বলেন, ‘মাঝে ভিক্ষুকের তালিকা হওয়ার সময় ওদের মা-ছেলের নাম দিয়েছিলাম। মনে করেছিলাম, যদি ২০-৩০ হাজার টাকা দেওয়া যায়, তাহলে ওরা কিছু করে খেতে পারবে। সেটাতো আর হলো না। সামনে কার্ড আসলে ওদের দেওয়ার চেষ্টা করব।’