সৌদি রাজতন্ত্রের বিদায়ঘণ্টা!

আপডেট: 09:40:17 15/11/2017



img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক : দুর্নীতিবিরোধী শুদ্ধি অভিযানের নামে সৌদি আরবে বেশ কয়েকজন প্রিন্সসহ পাঁচ শতাধিক অভিজাতকে আটকের ঘটনাটিকে দুর্নীতিবিরোধী জিহাদ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছেন যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। অভিযানটিকে দেখা হচ্ছে রীতি ভেঙে যুবরাজের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা হিসেবে, যা রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বকে প্রকট করে তুলেছে।
প্রভাবশালী ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের সম্পাদকীয় ভাষ্যে অভিযানটিকে সৌদি যুবরাজের 'গোপন অভ্যুত্থান' আখ্যা দেওয়া হয়েছে। অর্থনীতিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম লম্বার্ডি লেটার-এর বিশ্লেষক আলেসান্দ্রো ব্রুনো রুশ সংবাদমাধ্যম আরটির কাছে একই মতামত দিয়েছেন। তিনিও সৌদি বাদশাহ ও যুবরাজের যৌথ কর্মকাণ্ডকে রাজতন্ত্রের অভ্যন্তরে একটি অভ্যুত্থান হিসেবে দেখছেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম  ইকোনমিক টাইমস-এর বিশ্লেষণেও কূটনীতিকদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, প্রিন্স আর অভিজাতদের সাম্প্রতিক আটকের ঘটনাকে অভ্যুত্থানের প্রাসাদ ষড়যন্ত্র আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
রাজপরিবারের সদস্যদের ওপর প্রথম দফায় আটক অভিযান চালানো হয় ৪ নভেম্বর রাতে। ওই রাতে ১১ জনকে আটকের পরের দিনগুলোতে ধরপাকড়ের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের তালিকা দীর্ঘ হয়েছে। বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ এবং তার উচ্চাভিলাষী ছেলে মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস)-এর নির্দেশে তাদের আটক করা হয়। কয়েকদিনের মাথায় আটক হওয়া ব্যক্তিদের সংখ্যা ৫০০ ছাড়িয়ে যায়। এদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী এবং রাজপরিবারের নারী সদস্যও রয়েছেন। খোদ রাজপরিবারের সদস্যদের ওপর এমন ধরপাকড়কে সৌদি রাজতন্ত্রের পতনের শুরু বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। হাফিংটন পোস্টে গ্লোবাল পার্সপেক্টিভ কনসাল্টিং-এর প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড ওয়ালাওয়ুর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই ধরপাকড় একটি ব্যাপক রাজনৈতিক সুনামির জন্ম দিয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এর ঢেউ শুধু সৌদি আরবেই অস্থিরতার জন্ম দেবে না, বরং তা আছড়ে পড়বে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে।
৮২ বছর বয়সী বর্তমান বাদশাহর শারীরিক অবস্থা খারাপের দিকে। ফলে এখনই প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে বর্তমান বাদশাহর মৃত্যুর আগেই কি সৌদি আরবের ক্ষমতার মসনদে বসবেন সিংহাসনের পরবর্তী উত্তরাধিকারী মোহাম্মদ বিন সালমান? বাদশাহ কি নিজ থেকেই সরে যাবেন। এইসব প্রশ্নের সরাসরি উত্তর জানার পথ নেই। তবে এরইমধ্যে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সৌদি প্রিন্সের বরাত দিয়ে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান খবর দিয়েছে, রাজপরিবারের সিনিয়র সদস্যদের কাছে দুটি চিঠি বিতরণ করা হয়েছে। এতে তাদেরকে বাদশাহ সালমানের বিরুদ্ধে একটি অভ্যুত্থান ঘটানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
বেশিরভাগ বিশ্লেষকই এ বিষয়ে একমত যে, ৩২ বছরের উচ্চাভিলাষী যুবরাজ এরইমধ্যে একটা মারাত্মক ভুল করে ফেলেছেন। আর সেটা হচ্ছে, দেশটির ন্যাশনাল গার্ড প্রধান এবং সরকারের মন্ত্রী প্রিন্স মুতাইব বিন আব্দুল্লাহকে বরখাস্ত করা। এটা যুবরাজের কথিত সাহসী দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। প্রশ্ন উঠছে, আদতে এটা কোনো দুর্নীতিবিরোধী ক্রুসেড নয় তো? যুবরাজ আসলে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে চান। নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য কায়েমের পথে যাদেরই অন্তরায় বলে মনে করছেন; তাদেরই তিনি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করছেন বা সরিয়ে দিচ্ছেন। এখানে আরো স্বচ্ছতা বা স্বাধীনতার বুলি আওড়ানো অবান্তর।
ডজনখানেক প্রিন্স ও ব্যবসায়ীকে যখন আটক করা হয়; তখনো যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের পরবর্তী বাদশাহ হওয়ার পথে দুজনকে হুমকি বলে মনে করা হচ্ছিল। এদের একজন প্রিন্স মানসুর বিন মাকরিন রহস্যজনক এক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। অপরজন সৌদি সরকারের মন্ত্রী এবং ন্যাশনাল গার্ডের প্রধান প্রিন্স মুতাইব বিন আব্দুল্লাহকে তার দায়িত্ব থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। সৌদি আরবে ন্যাশনাল গার্ড একটি শক্তিশালী বাহিনী। এই বাহিনীতেও বহু অসন্তোষ রয়েছে। রাজপরিবারের ঐক্যের নীতি ভেঙে প্রিন্স, প্রিন্সেস ও ব্যবসায়ীসহ শত শত মানুষকে আটকের মাধ্যমে তাদের শত্রুতার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। রিয়াদের যে বিলাসবহুল রিটজ কার্লটন হোটেলে তারা আমন্ত্রণের অপেক্ষা করতেন; সেটিই আজ তাদের জন্য কারাগারে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এর শেষ কোথায়?
উদারপন্থী ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ-এ প্রকাশিত জেভি ব্যারেলের এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,  ধনকুবের আওলাদ বিন তালালের আটকের পর বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করা অনেক কঠিন হয়ে গেছে। দুই সপ্তাহ আগেই তিনি রিয়াদে বিনিয়োগকারীদের একটি সম্মেলনে সবাইকে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বলছিলেন। তখন কেউই ভাবতে পারেনি সেদিনের তালালকে গ্রেফতার করা হবে। যার এখন মোবাইল বা টেলিভিশন সুবিধা পর্যন্ত নেই। দুর্নীতি দমন কমিশন প্রধান হিসেবে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের এখন অনেক ক্ষমতা। কাউকে গ্রেফতার করা থেকে শুরু করে নিষেধাজ্ঞাও জারি করতে পারেন তিনি।
হারেৎজ-এ প্রকাশিত বিশ্লেষণধর্মী ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশেষজ্ঞরা প্রথমেই ধরে নিয়েছিলেন যে এটা মূলত বিন সালমানের কর্তৃত্ব সুসংহত করা ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন করার প্রয়াস মাত্র। অনেকে প্রকাশ্যেই বিষয়গুলো বলেছেন। কারণ এটা স্পষ্ট যে ব্যবসায়ী ও মন্ত্রীদের আটক করলেই দুর্নীতি দূর হয়ে যাবে না। প্রয়োজন সংস্কারের। কিন্তু এই সংস্কার সহজ নয়। সরকারি ও বেসরকারি অনেক ক্ষেত্রেই এখন দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে। বাদশাহ সালমানের জীবদ্দশায় যুবরাজ তার ক্ষমতা ব্যবহার করা শুরু করেছেন। তার মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা না করে নেওয়া এই পদক্ষেপকে রাজপরিবারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।
গার্ডিয়ানের সম্পাদকীয় ভাষ্যে বলা হয়েছে, সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান পরম্পরাগতভাবে ক্ষমতায় আসীন হয়েছেন: তিনি দেশটির প্রতিষ্ঠাতার পুত্র এবং ঐতিহ্যগতভাবে বাদশাহর পদটি বয়োজ্যেষ্ঠতা অনুযায়ী এক ভাই থেকে আরেক ভাইয়ের মধ্যে হস্তান্তর হয়। রাজতন্ত্রে বাদশাহর কথাই চূড়ান্ত। সেদিক থেকে এখন কেবল একজনই সৌদি আরব পরিচালনা করছেন। তিনি হলেন, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। তিনি যদি সিংহাসনে আসীন হন তবে ৩২ বছর বয়সী এ যুবরাজ রাষ্ট্রের ওপর পুরনো সৌদের প্রভাব ভেঙে দেবেন; যার ওপর ভর করে পরিবারটির গোষ্ঠীপতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সৌদি আরবে ধীর গতির এ অভ্যুত্থানের কারণে মরুভূমির এ দেশটির কোনো কিছুই বদলাচ্ছে না-আবার সবই বদলে যাচ্ছে। নজিরবিহীন এক গ্রেফতারি অভিযানের মধ্য দিয়ে রাজপুত্র, সাবেক মন্ত্রী এবং ধনকুবেরদেরকে একটি ফাইভ স্টার হোটেলে আটকে রাখা হয়েছে।
অর্থনীতিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম লম্বার্ডি লেটার এর বিশ্লেষক আলেসান্দ্রো ব্রুনোর সঙ্গে কথা বলেছে রুশ সংবাদমাধ্যম আরটি। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে কেবল তেলনির্ভর অর্থনীতির দুর্যোগ মোকাবিলার কৌশল কিংবা অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রশ্ন বলা যায় কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। ব্রুনোর মতে, যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান তার ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করছেন। ব্রুনো বলেন, ‘তিনি (সালমান) উচ্চাকাঙ্ক্ষী, কিন্তু সৌদি আরবের আধুনিকীকরণের ক্ষেত্রে তিনি আন্তরিক। এর পেছনে অন্য কোনো কারণ নেই, একটিই কারণ আছে। তা হলো, বড় ধরনের পরিবর্তন ছাড়া সৌদি রাজ পরিবার ভেঙে পড়বে।’
তিনি বলেন, মূল সমস্যা হলো সৌদি আরবের আয়কর নেই এবং গত কয়েক বছরে দেশটির তেল বিক্রিজনিত লাভ কমে গেছে। যদিও দেশে সংস্কার আনার বড় ধরনের পরিকল্পনা রয়েছে যুবরাজ সালমানের।
ব্রুনোর মতে, সেকারণেই সবচেয়ে ধনী রাজকন্যাকে আটকের লক্ষ্যবস্তু করেছেন এবং আটককৃতদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করে তা দিয়ে তেলের রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে চাইছেন।
বিশ্লেষকদের ধারণা, যুবরাজ সালমান সৌদি আরবের ধনকুবেরদের সঙ্গে নতুন ধরনের চুক্তিতে উপনীত হতে পারেন। বলতে পারেন, তারা এখন আর এতো সহজে নিজেদের সমৃদ্ধ করে পার পেতে পারবে না।
ব্রুনো বলেন, “আমি একে প্রাসাদ অভ্যুত্থান হিসেবে দেখছি। ১৯৯৫ সালে কাতারে এমন হয়েছিল। এটি যতটা না দুর্নীতিবিরোধী ‘জিহাদ’ তার চেয়ে অনেক বেশি করে পুরনো রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ঝড়ের আভাস।” 
সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

আরও পড়ুন