নিঃসন্তান দম্পতিও তুলছেন শিক্ষা সহায়ক ভাতা

আপডেট: 04:11:54 15/09/2018



img

স্টাফ রিপোর্টার : যশোরের চৌগাছার মাধবপুর উত্তরপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের (নতুন জাতীয়করণকৃত) সহকারী শিক্ষক হারুন অর রশীদ এবং তার স্ত্রী দুইজনই সম্প্রতি জাতীয়করণকৃত বিদ্যালয়ের শিক্ষক। মধ্যবয়সী এই দম্পতি নিঃসন্তান। কিন্তু সন্তান না হলে কি সন্তান লালনের জন্য সরকারের দেওয়া শিক্ষা সহায়ক ভাতার ৫০০ টাকা না নিয়ে বঞ্চিত থাকবেন! তিনি তো শিক্ষকনেতা। এই টাকা না নিয়ে কি তিনি থাকতে পারেন? উপজেলা শিক্ষা অফিসারকে ‘ম্যানেজ’ তো কোনো ব্যাপার না!
২০১৭ সালের জানুয়ারি মাস থেকে প্রতি মাসে ৫০০ টাকা করে শিক্ষা সহায়ক ভাতা তুলে নিচ্ছেন তিনি। উপজেলা শিক্ষা অফিসে গিয়ে ঘটনার সত্যতা জানার পর জানতে চাইলে হারুন অর রশীদ বলেন, ‘আমরা নিঃসন্তান দম্পতি। আমার ভাইয়ের মেয়েকে নিজের মেয়ে হিসেবে লালন-পালন করছি। সে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। তার কাগজপত্র শিক্ষা অফিসে জমা দিয়েছিলাম। সেই হিসেবে শিক্ষা সহায়তা ভাতা পাই। এটা অন্যায় হলে আর নেব না।’
হারুন অর রশীদ দাবি করেন তিনি একা নন। এমন অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকাই আছেন যাদের সন্তান না থাকলেও তারা শিক্ষা সহায়তা ভাতা নিচ্ছেন।
হারুন অর রশীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, উজিরপুর সরকারি (নতুন জাতীয়করণকৃত) প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে থাকাবস্থায় ¯িøপের ৭০ হাজার টাকার কোনো কাজ না করেই নিজে আত্মসাৎ করার। পরে দুর্নীতি দমন কমিশনের গণশুনানিতে বিষয়টি উত্থাপন হলে তিনি সে টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দিয়েছেন।
এদিকে, উপজেলার বকসীপুর সরকারি (নতুন জাতীয়করণকৃত) প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক জয়নুর রহমান ২০১৫ সাল থেকে একটি বাড়তি ইনক্রিমেন্ট নিচ্ছেন। সর্বশেষ আগস্ট মাসেও তিনি এই বাড়তি ইনক্রিমেন্ট নিয়েছেন বলে বেতন শিটে দেখা গেছে। উপজেলা শিক্ষা অফিসে গিয়ে তার সার্ভিস বুক যাচাই করে এর সত্যতা মিলেছে।
সার্ভিস বুকে দেখা গেছে, ২০১৮ সালের ১ জুলাই তার মূলবেতন ১৭ হাজার ৬২০ টাকা অব্যাহত আছে। তৃতীয় টাইম স্কেল অনুযায়ী যা হওয়ার কথা ১৬ হাজার ৭৮০ টাকা। অর্থাৎ সমপর্যায়ের অন্য শিক্ষক থেকে তিনি প্রতি মাসে প্রায় এক হাজার ৭২৬ টাকা বেশি উত্তোলন করছেন।
তার সার্ভিস বুকে দেখা গেছে, দুটি ফিক্সেশন করা আছে। প্রথমটি অনুযায়ী তিনি একটি ইনক্রিমেন্ট বেশি নিচ্ছেন। এরপরে সার্ভিসবুকে রিভাইজ ফিক্সেশন করা আছে এবং সেখানে তিনি বর্তমানে ১৬ হাজার ৭৮০ টাকা মূল বেতন পাবেন বলা থাকলেও সেটি না মেনে উপজেলা শিক্ষা অফিসের গাফিলতির সুযোগ নিয়ে পুরনো ফিক্সেশনে বেতন উত্তোলন করছেন। প্রায় তিন বছর যাবৎ তিনি এই ইনক্রিমেন্ট বেশি নিচ্ছেন।
জানতে চাইলে জয়নুর রহমান বলেন, ‘হিসাবরক্ষণ অফিসের ভুলে একটি ইনক্রিমেন্ট বেশি পাচ্ছি। এই ভুল শুধু আমার নয়, খোঁজ নিলে দেখা যাবে আরো অনেকেই বেশি ইনক্রিমেন্ট নিচ্ছেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘কয়েকজন শিক্ষক নিঃসন্তান হওয়ার পরও শিক্ষা সহায়তা বিল নিচ্ছেন। আমার যেহেতু ভুল হয়ে গেছে, দ্রুত অফিসে গিয়ে সংশোধন করে নেব।’
শুধু নিঃসন্তান দম্পতির শিক্ষা সহায়তা ভাতা বা ইনক্রিমেন্ট বেশি দেওয়াতেই থেমে নেই উপজেলা শিক্ষা অফিসের দুর্নীতি। উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেন এই অফিসে চলতি দায়িত্বে কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন ২০১৫ সালে। অভিযোগ রয়েছে, এরপর থেকেই অফিসটি দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে উপজেলার পিইডিপি-৩ প্রকল্পের আওতায় ১১৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে একটি করে ল্যাপটপ প্রদান করা হয়। রানিয়ালি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা আশরাফুন্নেছাকে দিয়ে প্রাপ্তি স্বাক্ষর শিটে স্বাক্ষর করানোর পর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেন সেটি রেখে দেন। তিনি সেটি তার ছেলেকে দিয়েছেন ব্যবহারের জন্য। আশরাফুন্নেছাকে বলা হয়, বিষয়টি কাউকে বলার দরকার নেই। এছাড়া জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে সাড়ে ৩৩ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকার পরও তিনি শিক্ষক প্রতি ২০০ টাকা আদায় করেছেন। যে সব শিক্ষক এই চাঁদার টাকা দিতে চাননি। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার হুমকি দিয়েছেন। জুলাই মাসে শিক্ষকদের ইনক্রিমেন্ট পাওয়ার সময়ে একজনের সার্ভিস বুকের মধ্যে অন্যজনের কাগজপত্র রেখে শিক্ষকদের কাছ থেকে ১০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হয়েছে। সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনের সমন্বিত যশোর জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক বরাবর একটি অভিযোগে এসকল তথ্য পাওয়া গেছে।
এ বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বেলায়েত হোসেন (চলতি দায়িত্ব) বলেন, ‘কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে শিক্ষা সহায়তা ভাতা ছাড় করা হয়। হারুন অর রশীদ নিঃসন্তান। তবুও শিক্ষা সহায়তা ভাতা তুলছেন বলে অভিযোগ পেলাম। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেব।’
‘বাড়তি ইনক্রিমেন্ট দেওয়ায় জয়নুরকে টাকা ফেরত দিতে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ১১৭টি ল্যাপটপ বিতরণ করা হয়েছে। রানিয়ালি স্কুলেও ল্যাপটপ দেওয়া হয়েছে। আত্মসাতের অভিযোগ সঠিক নয়। এছাড়া শিক্ষা সপ্তাহে কোনো চাঁদাবাজি করা হয়নি। ক্লাস্টারভিত্তিক শিক্ষকরা চাঁদা তুলে অনুষ্ঠান করেছে। কারো সাথে কোনো জোর করা হয়নি,’ দাবি করেন শিক্ষা কর্মকর্তা বেলায়েত।
এ বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শেখ অহিদুল আলম বলেন, তদন্তে দুর্নীতির প্রমাণ পেলে জড়িত শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন