উল্লেখযোগ্য ক্ষতি না হলে যশোরের বানান বদল কেনো

আপডেট: 03:52:37 21/04/2018



img
img

স্টাফ রিপোর্টার : গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকরা বলেছেন, যদি আমাদের উল্লেখযোগ্য কোনো ক্ষতি না হয়, তাহলে যশোরের ইংরেজি বানান নতুন করে লেখার প্রয়োজন নেই। আমাদের জেলার নাম আমরা সহজেই উচ্চারণ করতে পারি; ইংরেজরা সব বাঙলা শব্দ উচ্চারণ করতে পারে না। তারা যেভাবে উচ্চারণ করে, সেভাবেই তারা লিখেছে। নতুন বানানেও তারা আগের উচ্চারণই করবে।
শনিবার দুপুরে প্রেসক্লাব যশোর কনফারেন্স রুমে 'যশোরবাসী সমন্বয় কমিটি' আয়োজিত ‘যশোরের নয়া ইংরেজি বানানে সুবিধা-অসুবিধা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে আলোচকরা এসব মত দেন।
সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক ফারুক জাহাঙ্গীর আলী টিপু অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন করেন।
বৈঠকে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর মো. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, 'আমাদের আজকের যশোর একসময় যশোহর ছিল। কিন্তু এত বড় নাম উচ্চারিত না হয়ে যশোরে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ হয়। আর ইংরেজরা ঢাকা উচ্চারণ করতে পারতো না। বলতো ডেকা, তেমনি যশোরকে যেসর। তাদের বর্ণমালা এবং উচ্চারণ সংক্রান্ত সমস্যা, আমাদের নয়।'
তিনি বলেন, 'এ সময়ে যশোরের ইংরেজি বানান পরিবর্তন না করলেও চলতো। এতে যে আমাদের বিশাল কোনো লাভ হচ্ছে তাও না। প্রতিবেশী রাষ্ট্র তাদের জেলার নামের বানান পরিবর্তন করেছে, আমাদেরও তা করতে হবে- এমন কোনো কথা নেই। পশ্চিমবঙ্গে আগেও যে কয়টি জেলা ছিল, এখনো তা আছে। আমরা ১৬ থেকে ৬৪টি করেছি। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে তারা আমাদের চেয়েও এগিয়ে।'
দৈনিক গ্রামের কাগজ সম্পাদক মবিনুল ইসলাম মবিন বলেন, 'প্রত্যেকটি কাজেরই পক্ষে-বিপক্ষে মতামত ও যুক্তি থাকবে, বিতর্ক হবেই। প্রতিবাদ করে সব সমস্যার সমাধান আসলে হয় না। তবে, যশোরবাসী সমন্বয় কমিটির আজকের এ আয়োজন প্রশংসার যোগ্য।'
তিনি বলেন, 'আমাদের দেশের সব সরকারই যেকোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে জনমতকে উপেক্ষা করে। সাধারণ মানুষের মতামত বা চাহিদা যাচাই করে না। আমরা এই সিস্টেম থেকে বের হতে পারিনি।'
'আমার মনে হয় বাঙলা উচ্চারণের সাথে সঙ্গতি রেখে নতুন বানানটি করা হয়েছে। এই বিষয়ের সুবিধা বা অসুবিধাগুলো নিয়ে আমরা এখনো অনুমানের মধ্যে রয়েছি। সরকার যদি গেজেট প্রকাশ করে থাকে, তাহলে সেটি মেনে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই। আর কেউ বিরোধিতা করলে তাতে সরকারের কিছু এসে যায় না।'
লেখক, গবেষক, সাংবাদিক বেনজীন খান বলেন, 'নতুন কোনো বিষয় দেখলে বা শুনলে- সেটি নিয়ে আমরা চিন্তা করি; আমাদের ভেতরে বক্তব্যও জমা হয়। সেক্ষেত্রে আমরা যুক্তির চেয়ে আবেগটাকে বেশি প্রশ্রয় দিয়ে থাকি। আমাদের মনে রাখা উচিৎ, আবেগ কেবল সৃষ্টিই করে না; ধ্বংসও করে।'
তিনি বলেন, 'নতুন বানানে যে কথাটি উচ্চারিত হচ্ছে- তা হলো আমাদের ঐতিহ্য। আসলে কোনটা আমাদের ঐতিহ্য- সেটি আগে বিবেচনা করা দরকার। ইংরেজরা এসে আমাদের ঐতিহ্য ধ্বংস করে দিয়েছে। কী দিয়ে আমরা ঐতিহ্য বিচার করবো- সেটিও বিবেচনার দাবি রাখে। আসলে যশোরের ইংরেজি বানানের চেয়ে কোন বাঙলা বানানটা আমাদের ঐতিহ্য, যেমন জসর, যশোর, যশোহর, সেটি আগে নির্ধারণ করা। ইংরেজরা কী বানান লিখবে বা তাদের কোনটি ঠিক- তা সংশোধনের দায়িত্ব আমাদের না।'
তিনি বলেন, 'ফ্রান্স, চীন, জার্মানি প্রভৃতি দেশ তাদের নিজের ভাষায় সবকিছু করে। অন্যদেশ তাদের প্রয়োজনে সে দেশের ভাষা শিখে যোগাযোগ স্থাপন করে। আমরা বাঙলাকে যেন সেই মর্যাদায় নিয়ে যেতে পারি, সেই কাজটি করা জরুরি।'
তিনি বলেন, 'বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘে বাঙলায় তার বক্তব্য পেশ করেছিলেন; এটি আমাদের অহংকার। বাঙলাকে সেই মর্যাদায় নিয়ে যাওয়াটাই প্রধান।'
তিনি বলেন, 'আগের বানানে শব্দগত বা অর্থগত বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন না হলে তা বদলের প্রয়োজন নেই। শুধুমাত্র ইতিহাস হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় স্টান্টবাজি সমাজের জন্যে সুখকর নয়।'
সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের জেলা সভাপতি ডিএম শাহিদুজ্জামান বলেন, 'আমরা সরকারের কোনো পরিকল্পিত ফাঁদে পা দিচ্ছি কি না- তা ভেবে দেখার বিষয়। যশোরসহ সারাদেশে পাহাড়সম সমস্যা রয়েছে; সেসব বাদ দিয়ে এই বানান সমস্যাকে এতো প্রাধান্য দেওয়ার কিছু নেই। যশোর রোডের বৃক্ষ নিধন, সুন্দরবনে বিদ্যুৎকেন্দ্র, ভৈরব নদ সংস্কার সংক্রান্ত জটিলতা, জেলার রাস্তাঘাটের দুরবস্থার বিষয়টি থেকে চিন্তা অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার জন্যে এসব করা হচ্ছে কি না তা ভেবে দেখা দরকার।'
তিনি বলেন, 'বাঙালির আরেক ঐতিহ্য পহেলা বৈশাখ উদযাপন। এ নিয়ে মোল্লাতন্ত্র চালু হয়েছে। পহেলা বৈশাখে নতুন পানজাবি, মাছ খাওয়া নিয়ে সম্প্রদায়গত ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে। আজ আমাদের বাঙালিত্ব, আমাদের সংস্কৃতি হুমকির মুখে। এসব বিষয়ে আগে সোচ্চার হওয়া দরকার।'
সুবর্ণভূমি সম্পাদক আহসান কবীর বলেন, 'আঞ্চলিক, রাষ্ট্রে নানা ধরনের সংকট রয়েছে- এটি সত্য। সেসব বিষয় ছাড়াও আঞ্চলিক এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনার যৌক্তিকতা রয়েছে। জেলার নামের ইংরেজি বানান পরিবর্তনে আমাদের কী ধরনের সুবিধা বা অসুবিধা হচ্ছে- সেটি নিয়ে আমি নিশ্চিত নই।'
তিনি বলেন, 'আগে রাজা-বাদশারা ফরমান জারি করে যেকোনো কিছু পরিবর্তন করতো। এখন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। যশোরে প্রায় ২৫ লাখ অধিবাসী। তারা কি চেয়েছে- এই বানান পরিবর্তন করতে? এটি কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থার ফল।'
তিনি বলেন, 'পরিবর্তিত বানানে যদি সঠিকভাবে যশোর উচ্চারিত না হয়, যদি শুদ্ধ না হয়- তাহলে আমরা তা কেনো মানবো?'
উন্নয়নকর্মী হাসিব নওয়াজ বলেন, 'জেলার ইংরেজি বানানের গেজেট হয়ে গেছে; এখন এটি মানতেই হবে। আর নামের ইংরেজি বানান আমাদের ঐতিহ্য- এটি ঠিক নয়। ইংরেজি বানানে যশোরের উচ্চারণ কোনোটিই সহি না। আমার জেলার নাম সবাই পরিষ্কারভাবে উচ্চারণ করতে পারবে- এটিই আমাদের চাওয়া। এখন এই বানান ইস্যুটা জরুরি কিছু নয়। যশোরের আরো অনেককিছু রয়েছে, যেগুলো ঐতিহ্যবাহী, আসুন আমরা সেগুলো সংরক্ষণে সোচ্চার হই।'
বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জাকির হোসেন পলাশ বলেন, 'মানুষ সৃষ্টির জন্যেই বাঁচে। আর সেই সৃষ্টি যদি কল্যাণকর না হয়- তা হলে সেটি দিয়ে আমরা কী করবো? যশোরের নতুন বানানে তেমন কল্যাণকর কিছুই নেই।'
এডাব যশোরের সদস্যসচিব শাহজাহান নান্নু বলেন, ''এই নতুন বানানে আমাদের কোনো লাভ নেই। বরং ঐতিহাসিক 'যশোর রোড' ইত্যাদি আমাদের অহংকার। এটি পরিবর্তন মানেই ঐতিহ্যে আঘাত। পুরনো বানানেই আমরা অভ্যস্ত, সেটিই আমাদের কাছে সুখকর।'

আরও পড়ুন