২৩ গ্রামের মাঠজুড়ে শুধুই উচ্ছে

আপডেট: 07:08:36 21/04/2017



img
img

রূপক মুখার্জি, লোহাগড়া (নড়াইল) : সূর্য উঁকি দেওয়ার আগেই লোহাগড়ার নলদী ইউনিয়নের ‘উচ্ছেপল্লী’তে তৈরি হয় এক অন্য পরিবেশ। শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষ নেমে পড়েন মাঠে। গাছ থেকে উচ্ছে সংগ্রহের কাজ করেন তারা। বিস্তীর্ণ ক্ষেতের মাঝে উচ্ছে সংগ্রহের এ বড়ই মনোরম।
লোহাগড়ার নলদীর ২৩টি গ্রাম এখন ‘উচ্ছেপল্লী’ হিসেবে খ্যাত। উচ্ছে চাষ করে এখানকার প্রায় ২০ হাজার কৃষক পরিবারেও এসেছে আর্থিক সচ্ছলতা। এখানে উৎপাদিত উচ্ছে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে যাচ্ছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়।
চাষিরা জানান, প্রায় ২০ বছর আগে এ অঞ্চলে উচ্ছের আবাদ শুরু হয়। পরীক্ষামূলকভাবে নলদী ইউনিয়নের কানাবিলে প্রথমে উচ্ছে আবাদ করা হয়। ফলন ভালো পেয়ে উচ্ছে আবাদের প্রতি কৃষকের আগ্রহ বাড়তে থাকে। বর্তমানে নলদী এলাকার ২৩টি গ্রামের মাঠজুড়ে শুধু উচ্ছে আর উচ্ছে। এমনকী বসতবাড়ির আঙিনা ও আশপাশেও উচ্ছের আবাদ করা হচ্ছে। এ বছর (২০১৬-১৭ মওসুম) ২১০ হেক্টর জমিতে প্রায় ৮৭৫ মেট্রিক টন উচ্ছের ফলন হয়েছে। অথচ এক সময় শুষ্ক মওসুমে এসব জমি অনাবাদি পড়ে থাকতো।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় চাষিরা জানান, ডিসেম্বরের প্রথম দিকে উচ্ছের বীজ বপন করা হয়। একটি তাওয়ায় (একটি স্থানে) ছয় থেকে সাতটি বীজ পুঁতে দেওয়া হয়। প্রায় দশ দিন পরে চারা গজায়। এরপর মাটিতে খড় বিছিয়ে দেওয়া হয়। ওই খড়ের ওপর লতিয়ে ওঠে উচ্ছেগাছ। দেড়মাস পর ফলন শুরু হয়। সার, ওষুধ, ভিটামিন ও সেচসহ পরিচর্যার জন্য প্রতি একরে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা খরচ হয়। ফলন ভালো হলে লাখ টাকার উচ্ছে বিক্রি করা যায়।
উচ্ছেগাছ থেকে ফলন পাওয়া যায় তিন মাস পর্যন্ত। ক্ষেতের আকার ভেদে একজন চাষি প্রতিদিন এক হাজার থেকে শুরু থেকে পাঁচ হাজার টাকার উচ্ছে বিক্রি করতে পারেন। মওসুমের শুরুতে কেজিপ্রতি উচ্ছে ৮০ টাকা বা তার কাছাকাছি দরে বিক্রি হয়। মাঝামাঝি সময়ে প্রতি কেজি ৪০ থেকে ৫০ টাকা এবং শেষের দিকে ২০ থেকে ২৫ টাকা পাইকারি দরে বিক্রি হয়। ক্ষেতের প্রায় সব উচ্ছে যখন শেষ হয়ে আসে, তখন অবশ্য আবার দাম বাড়তে থাকে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নলদী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে সবুজ পাতা আর হলদে ফুলের মাঝে জড়িয়ে আছে বোল্ডার জাতের উচ্ছে। এসব ক্ষেতে মৌমাছির উড়াউড়িও কম নয়। উচ্ছের হলদে ফুল থেকে মধু আহরণের এ দৃশ্য সহজেই নজর কাড়ে, আকৃষ্ট করে সবাইকে। কানাবিলের উচ্ছে চাষি অনিতা ও ঊষারানী জানান, এ অঞ্চলের প্রায় সব কৃষক উচ্ছে চাষ করছেন। ভালো ফলনে খুশি তারা।
বিদ্যুৎ নামে আরেক চাষি জানান, প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বিলের আশেপাশে উচ্ছে বেচাকেনার বাজার বসে। বাইরে থেকে আসা ব্যাপারিরা এখান থেকেই পাইকারি দরে উচ্ছে কিনে নেন।
গাছবাড়িয়া গ্রামের আরতী বলেন, ‘আমাদের উচ্ছে খুলনা, ফরিদপুর, বরিশাল, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে।’
লক্ষ্মণকুমার জানান, এবার ৩৮ শতক জমিতে উচ্ছে চাষ করেছেন তিনি। প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ কেজি করে বিক্রি করছেন।
কানাবিলের নারী কর্মী লাকি বলেন, ‘সবুজ পাতার ভাজে ভাজে লুকিয়ে থাকা উচ্ছেগুলো একটা একটা করে তোলা হয়। ভোর থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত ৫০ থেকে ৬০ কেজি উচ্ছে তোলা যায়। প্রতি কেজি উচ্ছে তোলার জন্য আমাদের দুই টাকা করে মজুরি দেওয়া হয়। প্রতিদিন ক্ষেতের একেকটি অংশ থেকে উচ্ছে তোলা হয়। সেই হিসেবে প্রতিটি ক্ষেত থেকে গড়ে প্রতিদিনই উচ্ছে তোলা যায়।’
ওই বিলের অপর কর্মী শাবানা খাতুন জানান, এ অঞ্চলের প্রতিটি মাঠে অন্তত ৫০ জন নারী উচ্ছে তোলা ও বাজারজাতকরণের কাজ করেন। এ হিসেবে প্রায় এক হাজার নারী এ কাজের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। উচ্ছের বীজবপন, পরিচর্যা ও তোলার ক্ষেত্রে নারীদের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে।
লিটন নামে আরেক ব্যক্তি জানান, এ বছর বোল্ডার জাতীয় উচ্ছে বীজের সঙ্গে করলা বীজের মিশ্রণ থাকায় এ এলাকার চাষিরা কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কারণ, উচ্ছের চেয়ে করলার দাম ও চাহিদা কম।
বারইপাড়ার ওহিদুর রহমান (৫৫) বলেন, ‘‘১৯৯৬ সালে কানাবিলে আমি প্রথম উচ্ছে চাষ শুরু করি। আমার দেখাদেখিতে অন্যরা শুরু করেন। ক্রমে নলদী এলাকার ২৩টি গ্রামের কৃষকের মাঝে উচ্ছে চাষের আগ্রহ বাড়তে থাকে। চৈত্র-বৈশাখ মাসে উচ্ছে বিক্রির টাকার ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে প্রতিটি ঘরে ঘরে। এ এলাকার ২৩টি গ্রাম এখন ‘উচ্ছেপল্লী’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। অথচ, এক সময় শুষ্ক মওসুমে এসব জমি অনাবাদি পড়ে থাকতো।’’
নলদী ইউনিয়নের বারইপাড়া গ্রামের সাব্বির শেখ জানান, অন্যান্য সবজি ও ফসলের তুলনায় কম খরচে আবাদ সম্ভব বলে কৃষকেরা উচ্ছে চাষে ঝুঁকেছেন। জমিতে মাত্র তিন থেকে চারবার সেচ দেওয়া লাগে। খুব বেশি সার ও কীটনাশকের প্রয়োজন হয় না। তবে, অতিবৃষ্টি, কুয়াশাচ্ছন্ন ও মেঘলা আবহাওয়া উচ্ছে চাষের জন্য ক্ষতিকর।
এদিকে, কচাতলার পাইকারি বাজারে যাতায়াতের প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তা কাঁচা হওয়ায় যোগাযোগের ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে বলে জানান উচ্ছের কারবারে জড়িতরা।
কচাতলার খুচরা ব্যবসায়ী বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘২০ বছর যাবত উচ্ছে কেনাবেচা করছি। খুচরা কিনে দূর-দূরান্তের ব্যাপারিদের কাছে পাইকারি দরে বিক্রি করি। নলদী ইউনিয়নে আমার মতো প্রায় তিন হাজার ব্যবসায়ী উচ্ছে কেনাবেচায় জড়িত।’
ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের পাইকারি ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেন জানান, এখান থেকে প্রতিদিন ৩৫ থেকে ৪০ মণ উচ্ছে কিনে ঢাকা, খুলনাসহ বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। ১২ বছর ধরে নলদী থেকে উচ্ছে কিনছেন তিনি।
গাছবাড়িয়ার আমিনুর মোল্যা জানান, মওসুমের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এ অঞ্চলের উচ্ছে চাষি, শ্রমিক, খুচরা ও পাইকারি ব্যবসায়ীদের মনে-প্রাণে এক অন্যরকম আনন্দ-আমেজ বিরাজ করে। যেন ঘরে ঘরে শুধু উচ্ছে বিক্রির টাকা আর টাকা।
লোহাগড়া বাজারের কাঁচামাল ব্যবসায়ী মনিরুল বলেন, ‘নলদী এলাকার উচ্ছের মান খুব ভালো। ক্রেতা চাহিদা রয়েছে। টাটকা বিক্রি করা যায়। বর্তমানে বাজারে ক্রেতা পর্যায়ে প্রতিকেজি উচ্ছে বিক্রি হচ্ছে ৪০ এবং করলা ৩০ টাকা করে।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নড়াইলের উপ-পরিচালক শেখ আমিনুল হক বলেন, ‘উচ্ছে কাঁচা তরকারি হিসেবে সুস্বাদু। পাশাপাশি এর রয়েছে ওষধি গুণ। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ ও বসন্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে সবজিটির।’
তিনি জানান, এ বছর ২১০ হেক্টর জমিতে ৮৭৫ মেট্রিক টন উচ্ছের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগই নলদী এলাকায়। তবে, নলদী ছাড়াও জেলার অন্যান্য এলাকায় দিন দিন উচ্ছের আবাদ বাড়ছে।

আরও পড়ুন