শ্রীপুরের বহু লোক ঘরছাড়া, ঈদআনন্দ মাটি

আপডেট: 09:13:48 02/07/2016



img
img

মাগুরা প্রতিনিধি : ইউপি নির্বাচন নিয়ে শ্রীপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে দু’টি খুনসহ একাধিক সংঘর্ষ, বাড়িঘর ভাংচুর-লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় সীমিত সংখ্যক লোক জড়িত থাকলেও  সামাজিক কোন্দলের কারণে প্রতিপক্ষের হামলা-মামলা, পুলিশি হয়রানি ও গ্রেফতার এড়াতে ঈদকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী এবং মুক্তিযোদ্ধারা বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যে কারণে এসব পরিবারগুলোতে  ঈদের আনন্দ মাটি হয়ে গেছে।
২৩ এপ্রিল নির্বাচনের পরের শ্রীপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের মদনপুর গ্রামে আওয়ামী লীগ সমর্থিত বিজয়ী ও পরাজিত দুই মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এদের মধ্যে গুরুতর জখম ছাত্রলীগ নেতা খলিলুর রহমান বর্তমানে ঢাকা মেডিকেল কলেজে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন। এর মাত্র একদিন পরে গত ২৫ এপ্রিল গয়েসপুর ইউনিয়নের বাগবাড়িয়া গ্রামে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে বাবলু শেখ নামে এক আওয়ামী লীগ কর্মি নিহত হন। একইদিন গভীর রাতে শ্রীপুর ইউনিয়নের কচুয়া গ্রামে আওয়ামী লীগের পরাজিত মেম্বার প্রার্থীর সমর্থকেরা বিজয়ী প্রার্থীর সমর্থকদের বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর ও ১০-১৫ জনকে কুপিয়ে জখম করে। এরপর গত ২৬ জুন আমলসার ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে ডাবলু ওরফে ডালু শেখ নামে এক যুবক নিহত হন। এ ঘটনায় ২৫টি বাড়িঘরে ব্যাপক ভাঙচুর লুটপাট ও ১৫ জন আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। শ্রীকোল ইউনিয়নে নির্বাচনের আগ থেকেই নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থী এমএম মোস্তাসিম বিল্লাহ সংগ্রাম ও স্বতন্ত্র প্রার্থী যুবলীগ নেতা কুতুবুল্লাহ হোসেন ওরফে কুটি মিয়ার সমর্থকদের মধ্যে হামলা-সংঘর্ষ শুরু হয়ে এখনো তা চলছে। গত ২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগে নির্বাচন কমিশন এই ইউনিয়নের বারইপাড়া কেন্দ্রের ভোট গ্রহণ বাতিল ঘোষণা করা হয় ।  তবে এখন পর্যন্ত সেখানে পুন: নির্বাচনের কোনো তারিখ ঘোষণা হয়নি। এখানে নৌকা প্রথীকের সমর্থক ও বিএনপির, জামায়াতের ধানের শীষ প্রতীকের সমর্থকরা এক জোট হয়ে স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী যুবলীগ নেতা কুতুবুল্লাহ হোসেন মিয়ার সমর্থকদের বাড়িঘরে একাধিকবার হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করেছে। বিগত নির্বাচনে বিপুল ভোটে নির্বাচিত চেয়ারম্যান যুবলীগ নেতা কুতুবউল্লাহ কুটির বাবা আকবর হোনেস মিয়া মুক্তিযুদ্ধে শ্রীপুর আঞ্চলিক বাহিনীর কমান্ডার ও উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা। মুত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন।
কুটি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের এক অংশের সঙ্গে নব্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপি-জামায়াত মিলে তার সমর্থকদের উপর হামলা-মামলা চলছে । তবে হামলার শিকার প্রত্যেকেই আওয়ামী লীগের পুরনো ত্যাগী নেতা-কর্মী। বাপ দাদার আমল থেকে আওয়ামী লীগ করে আসা অনেকেই জেলার প্রথম সারির মুক্তিযোদ্ধা।  একদিকে প্রতিপক্ষের হামলা এবং অন্যদিকে পুলিশ প্রশাসনের রোষাণলের শিকার হওয়ায় এ তিন ইউনিয়নের শ' শ' নির্দোষ আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী, মুক্তিযোদ্ধা একাধিক মামলার আসামি হয়ে ও প্রতিপক্ষের হামলার ভয়ে বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। অনেকে আসামি না হয়েও সামাজিক দলাদলির শিকার হয়ে পুলিশি আটকের ভয়ে বনে জঙ্গলে দিন-রাত কাটাচ্ছেন।
গয়েশপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি নেকবর আলী জানান, নির্বাচনী বিরোধ নিয়ে আওয়ামী লীগের দুইপক্ষের মধ্যে সংঘাতে একজন নিহত হওয়ার ঘটনায় প্রায় শতাধিক নিরীহ নেতা-কর্মীর বাড়িঘর ভাঙচুর লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২-৪ জন লোক জড়িত থাকলেও নিরীহ দলীয় কর্মী বাড়িঘরহারা ও আসামি হয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যাদের পরিবার ঈদকে সামনে রেখে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। 
নির্যাতনের শিকার শ্রীকোল গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্য মুক্তিযোদ্ধা শফিউদ্দিন জোয়াদ্দার ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা তারিকুল ইসলাম বলেন, একজন মুক্তিযোদ্ধা ও প্রতিষ্ঠাকালীন আওয়ামী লীগার  হয়েও কেবলমাত্র স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থক হওয়ায় আমার নিজের বাড়িতে মুক্ত হাওয়ায় অবস্থান করতে পারছি না। পবিত্র রমজান মাস ও ঈদকে সামনে রেখে রাত-দিন বনেবাঁদাড়ে, পাটক্ষেতে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। তার মত এ রকম দেড় শতাধিক পরিবারের সদস্য ঈদকে সামনে রেখে পলিয়ে বেড়াচ্ছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা বলেন, মুক্তিযোদ্ধা হয়েও স্বাধীনতাবিরোধীদের ভয়ে এখন আমাদের পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। ৭১ সালেও আমরা এরকম বিপদে ছিলাম না।
তারিকুল ইসলাম বলেন, তাদের নামে ১৫ টি মামলা দেওয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে শ্রীপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরোল হোসেন মোল্লা জানান, নির্বাচন পরবর্তী সময়ে কয়েকটি স্থানে সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। তবে এসব ঘটনায় কোনো নিরাপরাধ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে কি না তার জানা নেই। বর্তমানে উপজেলায় দলের মধ্যে শান্তিপূর্ণ অবস্থা বিরাজ করছে বলে তিনি দাবি করেন। 
মাগুরার পুলিশ সুপার একেএম এহসান উল্লাহ বলেন, নিরাপরাধ মানুষ যাতে মামলায় জড়িয়ে হয়রানির শিকার না হয়, সে ব্যাপারে তিনি শ্রীপুর থানা পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছেন।

আরও পড়ুন