লাইলাতুল কদর কবে কখন

আপডেট: 02:43:09 13/06/2018



img

ড. মাসউদ আল আজহারী

‘লাইলাতুল কদর’- এক মর্যাদাপূর্ণ রাত। মহিমান্বিত এ রাতের বর্ণনা ও পরিচয় পবিত্র কুরআন মাজিদে সুন্দর করে বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে,
“আমরা (সম্মানার্থে বহুবচনীয় সর্বনাম) একে (কুরআনকে) অবতীর্ণ করেছি মহিমান্বিত রাতে। (হে নবী) তুমি কি জান মহিমান্বিত রাত কী? মহিমান্বিত রাত হলো এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। এ রাতে ফেরেস্তারা এবং রুহ (জিব্রাইল) নিজেদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে প্রতিটি হুকুম নিয়ে (পৃথিবীতে) নেমে আসে। ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত রাতটি শান্তিময়”। (সুরা কদর)
আলোচ্য সুরাটিতে ‘লাইলাতুল কদর’- এর সুন্দর বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেদিকে যাওয়ার আগে জেনে নিই প্রথমে কদর শব্দের অর্থ। কদর অর্থ মাহাত্ম্য, সম্মান, মর্যাদা, তাকদির, মূল্য, আদেশ ইত্যাদি। যেহেতু এ রাত তাকদির সংক্রান্ত, এ কারণেই এটি মর্যাদাবান ও মহিমান্বিত। এছাড়া যারা সারা বছর সৎকর্ম হতে বিমুখ থাকার কারণে সম্মানিত ও মহিমান্বিতদের অন্তর্ভুক্তি অর্জনে ব্যর্থ হয়, তারা এ রাতে ক্ষমা প্রার্থনা করে ইবাদতের মাধ্যমে সম্মানিত ও মহিমান্বিত হয় বিধায় রাতটিকে মহিমান্বিত বলা হয়েছে। আবার এ রাতে পরবর্তী এক বছরের বিধিলিপি কর্ম বাস্তবায়নকারী ফেরেস্তাদের হাতে ন্যস্ত করা হয় বলেও ‘লাইলাতুল কদর’ বলা হয়। সুরা দোখানের প্রথম কয়টি আয়াতে তা স্পষ্ট করে বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে-“ নিশ্চয় আমি ওই গ্রন্থকে এক বরকতময় রাতে অবতীর্ণ করেছি। অবশ্যই আমি মানুষকে সাবধান করতে চেয়েছিলাম।” এখানে ‘বরকতময় মাস’ বলতে ‘লাইলাতুল কদর’ কে বুঝানো হয়েছে। আবার ‘লাইলাতুল কদর’–এর দুটি অর্থ গ্রহণ করা যেতে পারে। এক. এটি এমন একটি রাত যে রাতে তাকদিরের মীমাংসা করা হয়। এটি সাধারণ রাতের মতো নয়, এ রাতে তাকদিরের ভাঙা-গড়া চলে । দুই. এ রাত থেকেই কুরআন নাজিলের সূচনা হয়।
অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে ‘এক বরকতময় রাত’ বলতে ‘লাইলাতুল কদর’-কে বুঝানো হয়েছে। এ রাতে সৃষ্টি সম্পর্কিত সকল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মীমাংসা করা হয়, যা পরবর্তী লাইলাতুল কদর পর্যন্ত পুরা একটি বছরে সংঘটিত হবে। অর্থাৎ আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত তাকদিরের সকল স্থিরকৃত বিষয়ের মীমাংসা এ রাতে বাস্তবায়নকারী সংশ্লিষ্ট ফেরেস্তাদের নিকট হস্তান্তর করা হয়। সুরা দোখানের চতুর্থ আয়াত এ বক্তব্য সমর্থন করে। “এই রাতে আমার নির্দেশে সকল বিষয়ের সুবিচারমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়”। অর্থাৎ আদি থেকে স্থিরকৃত তাকদির হতে পরবর্তী এক বছরে কোনো ব্যক্তির জীবনে যা ঘটবে তার তালিকা বাস্তবায়নকারী ফেরেস্তাদের হাতে অর্পণ করা হয়।
এ রাতে তাকদির সংক্রান্ত বিষয়াদি নিষ্পন্ন হওয়ার অর্থ হলো, এক বছর অর্থাৎ আগামী লাইলাতুল কদর পর্যন্ত যেসব বিষয় প্রয়োগ করা হবে তা লাওহে মাহফুজ থেকে নকল করে বাস্তবায়নকারী ফেরেস্তাদের নিকট হস্তান্তর করা হয়। কেননা আসল বিধিলিপি আদিকালেই লিপিবদ্ধ করা হয়ে গেছে। হজরত ইবনে আব্বাসের উক্তি অনুযায়ী চারজন ফেরেস্তার কাছে এসব কাজ সোপর্দ করা হয়। তারা হলেন, হজরত মিকাইল, ইস্রাফিল, জিব্রাইল ও আজরাইল (আ.)। আবার রমজান মাসে শুধু কুরআনই অবতীর্ণ হয়নি; অন্যান্য আসমানি গ্রন্থও অবতীর্ণ হয়েছে। হজরত অয়াছেলা ইবনে আকসা থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, “রমজানের প্রথম রাতে হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর উপর সহিফাসমূহ, তাওরাত ষষ্ঠ রাতে, ১৩ রমজানের পর ইঞ্জিল এবং ২৪ রমজানের পর কুরআন অবতীর্ণ করা হয়”। (ইবনে কাসির)
উম্মতে মুহাম্মাদির জন্য এই রাতটি একটি বিশেষ নিয়ামত। উম্মতে মুহাম্মাদি যে শ্রেষ্ঠ জাতি তার প্রধান দলিল এই লাইলাতুল কদর। কেননা এ জাতির জীবন অন্য জাতির ন্যায় দীর্ঘ নয়। সে জন্য এই রাত জীবনে দীর্ঘ রাতের ইবাদতের সমতুল্য করে দিয়েছেন আল্লাহ রাব্বুল আলামিন। বলেছেন, ''কদরের রাত এক হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ” (সুরা কদর) । অর্থাৎ কদরের রাতে ইবাদত করা এক হাজার মাস ইবাদত করা থেকেও উত্তম। অবশ্য আরব দেশে বা আরব্বাসীরা অনেক বড় সংখ্যার ধারণা দেবার জন্য ‘হাজার’ শব্দ ব্যবহার করত। সুতরাং আয়াতের অর্থ হলো, এ রাতের ইবাদতে এতো বেশি নেকি ও কল্যাণ যে, হাজার হাজার মাস ধরে ইবাদত করলে যে নেকি অর্জন হয় তার থেকেও অধিক নেকি অর্জন হবে। বোখারি ও মুসলিম শরিফে হজরত আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি এ রাতে প্রতিদানের আশায় ইবাদতের জন্য দাঁড়িয়ে থাকে আল্লাহ তার আগে-পাছের সকল গুনাহ মাফ করে দেন’।
অতএব এ রাতের ফজিলাত, গুরুত্ব, মাহাত্ম্য, মর্যাদা ও সম্মান বর্ণনারও ঊর্ধ্বে। কথা হলো, এ রাতের ফজিলাত প্রাপ্তির জন্য কীভাবে ইবাদত করতে হবে? সারা রাত জেগে ইবাদত করতে হবে না কিছু অংশে করলে হবে? কারো পক্ষে যদি সারা রাত জেগে ইবাদত করা সম্ভব হয়, তবে তা নিঃসন্দেহে উত্তম। কিন্তু কেউ যদি এ রাতের মাহাত্ম্য ও গুরুত্ব অবগত হয়ে ও উপলব্ধি করে রাতের কিছু অংশে বা কিছু সময় ইবাদত করেন, তবে তিনি এ বিশাল নেকি অর্জন থেকে বঞ্চিত হবেন এ কথা বলা মোটেও সমীচীন হবে না। কেননা সুরা কদরের শেষ চারটি শব্দ থেকে তা বেশ ভালোভাবে অবগত হওয়া যায়। “তা হলো যা (শবে ক্বদর) ফজরের উদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে”। অর্থাৎ বরকতময় এ রাতের মাহাত্ম্য এ রাতের কোনো বিশেষ অংশে সীমিত নয়, বরং তা ফজরের উদয় পর্যন্ত ব্যাপ্ত। সুতরাং এ রাতের কোনো অংশে কেউ কদরের উদ্দশ্যে পুণ্যের আশায় ইবাদত করলে তিনি পূর্ণ নেকি অর্জন থেকে বঞ্চিত হবেন এমনটি বলা যাবে না। বরং তিনি হজরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত হাদিসের অন্তর্ভুক্ত হবেন। এ হাদিসে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি বিশ্বাসের সাথে পুণ্যের আশায় এ রাতে ইবাদত করে আল্লাহ তার পূর্বের গোনাহ মাফ করে দেন। তবে যে ব্যক্তি এ রাতে অধিক ইবাদত করবে সে তার উপযুক্ত প্রতিদান পাবে। সুতরাং সারা রাত ধরে ইবাদতকারী রাতের কিছু অংশ ধরে ইবাদতকারী অপেক্ষা যে উত্তম তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
রাতটি নির্ধারণের ব্যাপারে ব্যাপক মতবিরোধ পরিলক্ষিত হয়। এ সম্পর্কে চল্লিশের অধিক মতের সন্ধান পাওয়া যায়। তবে এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত নেই যে, লাইলাতুল কদর রমজান মাসেই অবস্থিত, অন্য মাসে নয়। সুরা দোখানের তৃতীয় ও চতুর্থ আয়াত এবং সুরা কদরের প্রথম ৩ আয়াত থেকে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। কদর প্রসঙ্গে নির্ভরযোগ্য কিছু হাদিস নিম্নরূপ :
বুখারি শরিফে হজরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে, ‘তোমরা রমজানের শেষ দশ দিনের বেজোড় তারিখে লাইলাতুল কদর অন্বেষণ কর’। বুখারি শরিফের অন্য এক হাদিসে রমজানের শেষ দশকে তা অন্বেষণের কথা বলা হয়েছে। হজরত আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত আবু দাউদ শরিফের একটি হাদিসে বলা হয়েছে, সেটি ২৭ বা ২৯ রাত। তার বর্ণিত মুসনাদে আহমদের একটি হাদিসে বলা হয়েছে, সেটি রমজানের শেষ দশ রাত। হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত বুখারি শরিফের একটি হাদিসে বলা হয়েছে, তাকে খোঁজ রমজানের শেষ দশ রাতের মধ্যে যখন মাস শেষ হতে আর নয় দিন বাকি থাকে। অথবা সাত দিন বা পাঁচ দিন বাকি থাকে। আরো গ্রহণযোগ্য একটি হাদিস হতে জানতে পারা যায় যে, শেষ দশকের ২৭তম রাত হলো কদরের রাত। আবার তাফরিরে মাজহারিতে বলা হয়েছে, প্রত্যেক রমজানে এ রাত পরিবর্তন হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বিধায় ২৭তম রাতকে প্রাধান্য দিয়ে অন্যান্য রাতকে ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না।
উপরের আলোচনা থেকে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া গেল যে, কদরের রাত রমজান মাসে, বিশেষ করে তার শেষ দশ রাতে। আরো জানা গেল যে, সেটি শেষ দশের বিজোড় রাতে।
সুরা কদরের ভাষ্য অনুযায়ী, এই রাতে হজরত জিবরাইল (আ.) তার সহযোগী ফেরেস্তাসহ অবতীর্ণ হয়ে ফজর পর্যন্ত শান্তি কামনা করতে থাকবেন।
রাতটি কেনো গোপন রাখা হয়েছে? মেশকাত শরিফে উবাদা ইবনে ছমেত থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে বলা হয়েছে, মহানবী (সা.) একদা কদরের তারিখ জানানোর জন্য বের হলেন। এমন সময় দুজন মুসলমান ঝগড়ায় লিপ্ত হলো। তাদের ঝগড়া শুনে তিনি বললেন, আমি বের হয়েছিলাম কদরের নির্র্দিষ্ট তারিখ জানানোর জন্য। কিন্তু তাদের ঝগড়ার কারণে তা উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই তারিখ অনির্দিষ্ট রাখার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আলেমরা যে কারণ উল্লেখ করেছেন তা নিম্নরূপ :
(ক) তা পাওয়ার আশায় বান্দা যেন রমজানের সারা রাত ইবাদত করে।
(খ) এ জন্য যে, বান্দা যেন এ রাতের মাহাত্ম্য থেকে বঞ্চিত হয়ে বেকদর না হয়ে যায়।
(গ) আল্লাহ তার ফেরেস্তাদের সাথে গর্ব করে যেন বলতে পারেন, দেখ, আমার বান্দারা তা পাওয়ার আশায় কীভাবে চেষ্টা করছে।
(ঘ) যেই মানুষ বুঝতে পারতো অমুক দিন শবে কদর, তা হলে তারা সারা বছর ইবাদত বন্দেগি করা ছেড়ে দিত।
তবে চান্দ্র বছরের হিসাবে অন্য কোনো রাত পালনের ব্যাপারে যায় হোক না কেনো, লাইলাতুল কদর পালনের ব্যাপারে বোধ করি ইমাই আবু ইউসুফ ও ইমাম মোহাম্মদ (রহ.) এর মত গ্রহণ করা খুবই যুক্তিযুক্ত। তারা বলেন, লাইলাতুল কদর রমজানের যে কোনো দিন হতে পারে। সুতরাং কোনো ব্যক্তি যদি রমজানের প্রথম রাত থেকে সেটি কদরের রাত মনে করে ঈমানের সাথে আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় কিছু সময় ইবাদত করে, তা হলে সে এ রাতের মাহাত্ম্য হতে বঞ্চিত হবে না- এ কথা বলা যায়।
সর্বোপরি দুনিয়ার ভৌগোলিক সীমারেখার কারণে এই জটিলতার সৃষ্টি হলেও মহান আল্লাহর দরবারে তো তেমন কোনো সীমাবদ্ধতা নেই। তিনি রমজান মাসের যে কোনো দিনে অথবা শেষ দশদিনের যে কোনো দিন শবে কদরের মাহাত্ম্য দান করবেন তেমনটি আশা করাই বাঞ্ছনীয়।
[লেখক : আল-আজহার থেকে ডিগ্রিপ্রাপ্ত, আলেমে দ্বীন]