বীজ আত্মসাৎ, ৪ উপ-পরিচালক সাসপেন্ড

আপডেট: 03:05:58 11/09/2019



img

তারেক মাহমুদ, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ) : ঝিনাইদহের দত্তনগর কৃষি খামারের ১২৯ দশমিক ২২০ মেট্রিক টন হাইব্রিড (এসএল-৮এইচ) জাতের ধান বীজ আত্মসাতের ঘটনায় চার উপ-পরিচালককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওযায় দত্তনগর ফার্মের গোকুলনগর খামারের উপ-পরিচালক তপনকুমার সাহা, করিঞ্চা খামারের উপ-পরিচালক ইন্দ্রজিৎচন্দ্র শীল, পাথিলা কৃষি খামারের উপ-পরিচালক আক্তারুজ্জামান তালুকদার এবং যশোর বীজ প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্রের উপ-পরিচালক আমিন উল্যাহকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ৯ সেপ্টেম্বর সোমবার বিএডিসির সচিব আব্দুল লতিফ মোল্লা স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এই আদেশ দেওয়া হয়।
প্রায় তিন কোটি টাকা মূল্যের এই ধান বীজ দত্তনগর কৃষি খামারের রেজিস্ট্রারের লিপিবদ্ধ না করেই বিক্রির জন্য যশোরের বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) বীজ প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রের গোডাউনে রাখা হয়। তবে, বিশাল পরিমাণের এই বীজ দত্তনগর থেকে যশোর গোডাউনে কীভাবে প্রবেশ করলো- এমন অভিযোগের তদন্ত করতে আসেন বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক (খামার) তপনকুমার আইচ এবং মহাব্যবস্থাপক (বীজ) নুরুননবী সরদার। ২৮ আগস্ট কর্মকর্তারা দত্তনগর কৃষি খামার ও যশোর বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে সরেজমিন পরিদর্শন করেন। তদন্তে অতিরিক্ত ১২৯.২২০ মেট্রিক টন বীজের সত্যতা প্রমাণিত হওয়ায় মহেশপুরের দত্তনগর কৃষি খামারের তিন উপ-পরিচালক ও যশোর বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের ওই উপ-পরিচালককে সাময়িক বরখাস্ত করে বাংলাশে কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। একই সঙ্গে আবার অধিকতর তদন্তের জন্য তিন সদস্যের আরো একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
১২.০৬.০০০০.২০৩.২৭. ২৮৩.১৯.৭২১/৭২২/৭২৩ ও ৭২৪ নম্বর স্মারকের ওই চিঠিতে বলা হয়, বিধিবহির্ভূতভাবে অসৎ উদ্দেশ্যে দত্তনগর কৃষি খামারের গোকুলনগর, পাথিলা ও করিঞ্চা বীজ উৎপাদন খামারে ২০১৮/১৯ উৎপাদন বর্ষে অতিরিক্ত ১২৯.২২০ মেট্রিক টন হাইব্রিড জাতের ধান বীজ প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র যশোরে পাঠানো হয়। অতিরিক্ত এই বীজ উৎপাদনের পরিমাণ নিয়মানুযায়ী মজুদ ও কাল্টিভেশন রেজিস্ট্রারে লিপিবদ্ধ করেননি। এমনকী অতিরিক্ত কোনো বীজ প্রেরণের কোনো চালান বা তথ্য প্রমাণ খামারে রাখেননি। উক্ত ধান বীজ আত্মসাৎ করার জন্য সংরক্ষণ ও উৎপাদন বিষয়ক প্রকৃত তথ্য গোপন করায় বিএডিসি কর্মচারী চাকরি প্রবিধানমালা ১৯৯০ এর ৩৯ (ক)(খ)(চ) দায়িত্ব পালনে অবহেলা, অসদাচারণ, চুরি, আত্মসাৎ, বিল তছরুপ ও প্রতারণার শামিল। ফলে বিধি মোতাবেক সংস্থার চাকরি থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক (খামার) বিএডিসি ঢাকা দপ্তরে সংযুক্ত করা হলো। এই সময়ে সাময়িক বরখাস্তকালীন বিধি মোতাবেক খোরপোষ ভাতা প্রাপ্য হবেন এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতি ব্যতিত কর্মস্থল ত্যাগ করতে পারবেন না বলেও চিঠিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে বীজ আত্মসাতের এ ঘটনা প্রকাশ হওয়ার পর থেকে খামারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকে অভিযোগ করে আসছেন, বীজ কেলেঙ্কারির সঙ্গে বিএডিসির বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জড়িত। ঊর্ধ্বতর কর্মকর্তাদের সহযোগিতা ছাড়া এতো বীজ গোপনে বিক্রি করা সম্ভব নয় বলে তাদের দাবি।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ভারতীয় সীমান্তে অবস্থিত এই কৃষি ফার্মের শ্রমিকরা জানান, প্রতি মৌসুমে কোন জমিতে কত পরিমাণ বীজ উৎপাদন হবে তার একটি আগাম তালিকা করা হয়। প্রতি একর জমিতে প্রায় তিন টন বীজ উৎপাদন হয়। কিন্তু দত্তনগর কৃষি ফার্মের বিভিন্ন বীজ উৎপাদন ফার্মের কর্মকর্তা ও যুগ্ম পরিচালক তপনকুমারের যোগসাজসে হেক্টরপ্রতি এক টন কম দেখিয়ে রিপোর্ট তৈরি করেন। ফলে প্রতি মৌসুমে ফার্মে উৎপাদিত বীজের একটি বড় অংশ তারা আলাদা করে রাখেন এবং বিএডিসির প্যাকেটে ঢুকিয়ে গোপনে বিক্রি করেন। একইভাবে ২০১৮-২০১৯ মৌসুমে উৎপাদিত অতিরিক্ত ১২৯ টন হাইব্রিড ধানের বীজ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে যশোর বীজ প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে তালিকাভুক্ত বীজের সঙ্গে একই লটে সংরক্ষণ করা হয়; যা সময় পেলেই কর্মকর্তারা বিক্রি করে দিতেন। এই জাতের প্রতিকেজি ধান বীজের মূল্য প্রায় ২৫০ টাকা। এই হিসেবে ১২৯ মেট্রিক টন বীজের আনুমানিক দাম প্রায় তিন কোটি টাকা।
এদিকে, দত্তনগর কৃষি খামার থেকে বীজ আত্মসাতের চেষ্টার ঘটনায় বহিষ্কৃতদের বিষয়ে অধিকতর তদন্তের জন্য বিএডিসি পরিচালক (অর্থ) মোমিনুর রশিদকে আহ্বায়ক ও ব্যবস্থাপক (বিক্রয়) সার ব্যবস্থাপনা আবুল কালাম আজাদ এবং উপ-পরিচালক (সংস্থাপন) রাজীব হোসেনকে সদস্য করে তিন সদস্যের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন দ্বিতীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ৯ সেপ্টেম্বর গঠিত এই কমিটিকে আগামী ১০ অক্টোবরের মধ্যে বিএডিসির চেয়ারম্যানের কাছে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কমিটিকে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের ২০১৮-১৯ অর্থবছরে যশোর বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র সদর দপ্তর থেকে প্রাপ্ত কর্মসূচিবহির্ভূত অতিরিক্ত ১২৯ দশমিক ২২০ টন হাইব্রিড বোরো ধানবীজের মধ্যে ৭৫ দশমিক ০৭৫ টন গোকুলনগর খামার, ৩২ দশমিক ১১০ টন পাথিলা খামার এবং ২২ দশমিক ০৩৫ টন কঞ্চিনা খামার থেকে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়া চালান ব্যতিরেকে তিন উপ-পরিচালক তপনকুমার সাহা, আক্তারুজ্জামান তালুকদার, ইন্দ্রজিত শীল এবং যশোরের উপ-পরিচালক আমিন উল্ল্যার পারস্পúরিক যোগসাজগে ধান বীজ আত্মসাতের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে- এমন অভিযোগের সরেজমিন তদন্ত করে সুষ্পষ্ট মতামতসহ প্রতিবেদন ও সুপারিশ দাখিলেরও নির্দেশ দেওয়া হয়।
২০১৮-২০১৯ উৎপাদন মৌসুমে দুই হাজার ৭৩৭ একর জমির উপর অবস্থিত ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার দত্তনগর কৃষি ফার্মের পাথিলা বীজ উৎপাদন খামার থেকে ৬৯ দশমিক ৫০০ মেট্রিক টন এবং গোকুলনগর বীজ উৎপাদন খামার থেকে ১১৭ দশমিক ২৬০ টনসহ দুটি খামার থেকে সর্বমোট ১৮৬ দশমিক ৭৬০ টন (এসএল-৮এইচ) জাতের হাইব্রিড ধান বীজ যশোর বীজ কেন্দ্রে পাঠানো হয়। কিন্তু অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করতে যেয়ে অতিরিক্ত ১২৯ দশমিক ২২০ মেট্রিক টন বীজের সন্ধান মেলে।
তবে, যশোর বীজ গোডাউনে কীভাবে অতিরিক্ত ১২৯ দশমিক ২২০ টন ধানের বীজ গেল তার তথ্য প্রেরণের জন্য যশোর বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের উপ-পরিচালক আমিন উল্লাহ বকুলকে ২২ আগস্ট চিঠি দেওয়া হয়। এরপর ২৮ আগস্ট বিএডিসির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দত্তনগর কৃষি খামার ও যশোর বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে সরেজমিন পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শন দলের সদস্য বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক (খামার) তপনকুমার আইচ বলেন, ‘যশোর বীজ প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রে যে অতিরিক্ত বীজ রয়েছে প্রাথমিক তদন্তে তা প্রমাণিত হয়েছে। আমি নিজে দত্তনগর কৃষি ফার্মে গিয়ে বিভিন্ন কর্মকর্তার সাথে কথা বলে অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছি। অধিকতর তদন্তের জন্য আরো একটি কমিটি গঠন করেছে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। তদন্তে দোষীদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
১৯৪০ সালের দিকে কলকাতার বিশিষ্ট ঠিকাদার হেমেন্দ্রনাথ দত্ত দত্তনগর খামারটি প্রতিষ্ঠা করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর খাবার সরবরাহকারী ঠিকাদার ছিলেন তিনি। হেমেন্দ্র দত্ত সেনাবাহিনীর জন্য তাজা সবজি উৎপাদনের জন্য নিজ গ্রাম দত্তনগরে খামার করেন। তিনি রেলপথে দর্শনা স্টেশনে সবজি বহন করে কলকাতায় নিতেন। তবে সেটি ছিল কষ্টের। যার কারণে সেখানে হেলিপ্যাড স্থাপন করেন। এরপর প্রতিদিন তিনি হেলিকপ্টারে করে এই খামারে উৎপাদিত শাকসবজি কলকাতায় সরবরাহ করে খ্যাতিও লাভ করেন। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর হেমেন্দ্রনাথ দত্ত দত্তনগর ছেড়ে কলকাতা চলে যান। সেই সময় তার কর্মচারীরা এটি দেখাশোনা করতেন। ১৯৪৮ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার খামারটি অধিগ্রহণ এবং কৃষি বিভাগের কাছে সব দায়িত্ব অর্পণ করে। ১৯৬২ সালে ফার্মের যাবতীয় সম্পত্তি কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেই থেকে এখানে বিএডিসি প্রতি বছর বিভিন্ন ধরনের বীজ উৎপাদনের কার্যক্রম করে আসছে। প্রায় দুই হাজার ৭৩৭ একর জমি নিয়ে এটি পাঁচটি খামারে বিভক্ত। এটি এশিয়া মহাদেশের দ্বিতীয় বৃহৎ কৃষি ফার্ম। এখানে উৎপাদিত বীজ বাংলাদেশ, এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হয়। বছরে এখানে প্রায় পাঁচ হাজার টন ভিত্তিবীজ উৎপাদন করা হয়। বর্তমানে এখানে আউশ, পাট, গম, মুগ, নেরিকা, কলাই, ভুট্টা, হাইব্রিড ধান, আলুসহ বিভিন্ন ফসলের বীজ উৎপাদন করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন