বিশ্ববিখ্যাত ব্লাকবেঙ্গল গোট পালনে নানা সংকট

আপডেট: 02:22:55 29/01/2019



img
img

চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি : চুয়াডাঙ্গায় বিশ্বখ্যাত ব্লাকবেঙ্গল জাতের ছাগল উৎপাদন বাড়লেও রোগ বালাই প্রতিরোধে সহযোগিতা করছে না প্রাণিসম্পদ দপ্তর। এই কারণে হতাশ হয়ে ছাগল পোষা কমিয়ে দিচ্ছেন অনেকে। এতে বিখ্যাত এই জাতের ছাগল উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটার সম্ভবনা দেখা দিয়েছে।
চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার কয়া গ্রামের জলিলের স্ত্রী সকিনা (৭০) সাত বছর আগে ভিক্ষে করতেন। তাকে ভিক্ষাবৃত্তি থেকে স্বাবলম্বী করতে হাত বাড়িয়ে দেয় বেসরকারী সংগঠন ‘ওয়েভ ফাউন্ডেশন’। সকিনাকে ভিক্ষুক পুনর্বাসন কার্যক্রমের আওতায় এনে তার বসতবাড়িতে ছাগলের ঘর তৈরি করে দেয় প্রতিষ্ঠানটি। সেই সঙ্গে দেওয়া হয় চারটি ছাগল। ওই ছাগল থেকে তার ঘরে এখন ৩২টি ছাগল রয়েছে। এরই মধ্যে তিনি বিভিন্ন ওজনের এবং আকৃতির ছাগল বিক্রি করে মোটামুটি সচ্ছল জীবনে ফিরে এসেছেন। এক সময় তিনি প্রতিবেশীদের সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে জীবন-জীবিকা চালালেও এখন তাদেরই উল্টো সহযোগিতা করছেন। ঠিক একইভাবে বিশ্বখ্যাত ব্লাকবেঙ্গল জাতের ছাগলের উৎপাদন ধীরে দীরে বিস্তার ঘটে চুয়াডাঙ্গা জেলায়।
একই উপজেলার হরিহরনগর গ্রামের দক্ষিণপাড়ার মরহুম সিরাজুল মণ্ডলের ছেলে রিকশা-ভ্যানচালক আবু সিদ্দিক মণ্ডল (৪৮) ও তার স্ত্রী মালেকা খাতুন (৪০) আট বছর আগে থেকে তাদের বসতবাড়ির এক অংশে বাঁশের তৈরি ঘর করে সেখানে দুটি মা ছাগল পোষা শুরু করেন। তাদের ৪০টি পর্যন্ত ছাগল ছিল। প্রকার ভেদে তারা এক হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৮-৯ হাজার টাকা দরে ছাগল বিক্রি করেছেন। বর্তমানে তাদের ১৫টি ছাগল রয়েছে।
রিকশা-ভ্যান চালক আবু সিদ্দিক মণ্ডল আক্ষেপ করে জানান, চিকিৎসার অভাবে তাদের ১৪টি ছাগলের বাচ্চা মারা গেছে। চিকিৎসার জন্য তারা সরকারি ও বেসরকারিভাবে কোনো সহযোগিতা পাননি। ছাগলের খাবার সম্পর্কে তাদের ধারণা কম ছিল। এর ফলে ক্ষেতে ডোবা বিষাক্ত ঘাস খাওয়ানো হয় এবং ছাগলের বাচ্চাগুলো মারা যায়। ছাগল অসুস্থ হয়ে পড়লে চিকিৎসা নিতে হয়রানি হতে হয় বলে আবু সিদ্দিক মণ্ডল ছাগল পোষা কমিয়ে দিয়েছেন।
ওই গ্রামের মাঠপাড়ার মরহুম দুখু মণ্ডলের ছেলে চাষি আনসার আলী মণ্ডল (৭০) জানান, ৩৫ বছর ধরে তিনি ছাগল পোষেন। ছয় হাজার থেকে দশ হাজার টাকার মধ্যে তিনি ছাগল বিক্রি করে আসছেন।
বর্তমানে তার ১৭টি ছাগল রয়েছে। ওই গ্রামের মরহুম দুখে মণ্ডলের ছেলে দোকানদার রফছেদ আলী (৫৮) বলেন, তিনি দেশ স্বাধীনের পর থেকে ছাগল পোষেন। বর্তমানে তার ১১টি ছাগল রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে ছাগলের চিকিৎসা সেবা তিনি পাননি।
একই উপজেলার বেনীপুর গ্রামের পশু চিকিৎসক এনামুলই তার ভরসা।
হরিহরনগর গ্রামের দক্ষিণপাড়ার সিরাজুল বিশ্বাসের ছেলে চাষি আবু সাঈদ (২৭) জানান, ১৯৯৭ সাল থেকে তারা ছাগল পোষেন। রোগ-বালাইয়ের কারণে ছাগল পোষা কমিয়ে দিয়েছেন তারা।
তিনি আরো জানান, ছাগল পুষতে তেমন খরচ হয় না। সকালে ও বিকেলে মাঠে পাল ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই খাদ্য খাবার খেয়ে ছাগল বড় হয়।
একই উপজেলার গোয়ালপাড়ার দক্ষিণপাড়ায় মরহুম শামসুদ্দিন মণ্ডলের মেয়ে হাওয়া খাতুন (৫০) ভিক্ষে করে জীবন চালাতেন। তাকে বেসরকারি সংগঠন ওয়েভ ফাউন্ডেশন চার বছর আগে চারটি ছাগল দিয়ে সহযোগিতা করে। এরপর থেকে তার দশটি ছাগল। পর্যায়ক্রমে ছাগল বিক্রি করে তার জীবিকা চলে।
গোয়ালপাড়ার মরহুম গোলাম মোস্তফার ছেলে রিকশা-ভ্যান চালক আমির হোসেন (৪৮) ছয়টি ছাগলের মালিক। ছাগল পুষে বেশ ভালোভাবে জীবন চালাচ্ছেন তিনি।
জেলার দামুড়হুদা উপজেলার জুড়ানপুর ইউনিয়নের বিষ্ণুপুর গ্রামের দুর্ঘটনায় আহত হয়ে প্যারালাইজড অবস্থায় মারা যান ট্রাকচালক স্বামী আলতাফ হোসেন। তার স্ত্রী উলফাতারা খাতুন (৩৫) দীর্ঘদিন ধরে বাঁশের মাচা পদ্ধতিতে ছাগল পালন করছেন। বর্তমানে তার ১৫টি ছাগল রয়েছে। ছাগল বিক্রি করে তিনি কিছু জমিজমা কিনেছেন। ছাগলই তার সংসার সচ্ছল করেছে বলে তিনি জানান।
আলমডাঙ্গা উপজেলার আইলহাস ইউনিয়নের জাহাপুর গ্রামের আলমসাধুচালক আশরাফের স্ত্রী রাফেজা বেগম (৪৫)। তিনি ব্লাকবেঙ্গল জাতের ছাগল পালন করে বেশ উন্নতি করেন। ছাগল বিক্রি করে স্বামীর জন্য একটি আলমসাধু কেনেন। পাঁচ শতক জমি কিনেছেন। ছাগল পালনের পর তা বিক্রি করে সেই টাকায় বর্তমানে তার ছেলে ডন এইচএসসি প্রথম বর্ষের আর মেয়ে ডলি দশম শ্রেণিতে পড়াশুনা করছে। তার দেখাদেখি পাশে অনেকেই মাচা পদ্ধতিতে ছাগল পালন করে সংসারে আয় বৃদ্ধি করে থাকে। রাফেজা বেগম হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলেন, ‘আগে খুব কষ্ট করেছি, বর্ষাকালে রিকশাভ্যান চলতো না। প্রায় না খেয়েই থাকতে হতো। এখন বর্ষাকালের চিন্তা করতে হয় না। সারা বছর ছেলে-মেয়ের লেখাপড়ার খরচ আমিই চালাই। খেয়েপরে দিন ভালোই কাটছে।’
বর্তমান তাদের পাঁচটি মা ছাগল ও তিনটি খাসি ছাগল রয়েছে।
আলমডাঙ্গা উপজেলার বেলগাছী ইউনিয়নের ফরিদপুর গ্রামের বিল্লাল হোসেনের স্ত্রী রেহেনা খাতুন (৩৭)। এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে তাদের সুখের সংসার। বিয়ের এক বছরের মাথায় তার ছেলের জন্ম হয়। প্রায় তিন বছর পরই এক মেয়ের জন্ম হয়। স্বামীর জমি জায়গা বলতে শুধুমাত্র দেড় বিঘা ফসলি জমি ও পাঁচ কাঠা বাড়ির ভিটা জমি রয়েছে। পাশাপাশি বাড়িতে হাঁস-মুরগি পালন করেন রেহেনা। সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ২০১৪ সালের নভেম্বর মাসে ওয়েভ ফাউন্ডেন থেকে দশ হাজার টাকা ছাগল পালন ঋণ নিয়ে দুটি মা ছাগল কেনেন তিনি। বাকি টাকা দিয়ে ছাগল রাখার জন্য তিনি বাঁশের মাচা তৈরির কাজে ব্যয় করেন। দুটি মা ছাগল থেকে প্রথম বছরই আরো চারটি মা ছাগল ও দুটি খাসি ছাগল জন্ম নেয়। বর্তমানে তার মা ও খাসি ছাগলসহ দশটি ছাগল রয়েছে। ছাগল পালন করে সেগুলো বিক্রি করেই রেহেনা খাতুন বেশ ভালো আছেন। সরকারিভাবে নয়, ওয়েভ ফাউন্ডেশনের ছাগল পালন কর্মসূচির আওতায় পিও টেকনিক্যাল থেকে ছাগলের বিভিন্ন রোগের লক্ষণ ও প্রতিষেধক টিকা সুবিধা পেয়ে থাকেন তিনি।
চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. গোলাম মোস্তফা বলেন, এ জেলায় ১৩ হাজার উপকারভোগীকে নিয়ে ছাগল উৎপাদন কার্যক্রম চলছে। তাদের হিসেবে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলায় ৯৮ হাজার ৩৪২টি, আলমডাঙ্গা উপজেলায় এক লাখ ৩০ হাজার ২৫১টি, দামুড়হুদা উপজেলায় এক লাখ তিন হাজার ৪৬০টি ও জীবননগর উপজেলায় এক লাখ এক হাজার ৫০০টি ছাগল রয়েছে। জেলায় মোট ছাগলের সংখ্যা চার লাখ ৩৩ হাজার ৫৫৩।
লোকজন ছাগল পুষতে গিয়ে চিকিৎসা সেবা পেতে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন- এমন অভিযোগ ঠিক নয় বলে তিনি দাবি করেন।
ভ্যাকসিনের অপ্রতুলতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা দামুড়হুদা ও জীবননগর উপজেলায় শতভাগ পিপিআর ভ্যাকসিন নিশ্চিত করেছি। সদর ও আলমডাঙ্গা উপজেলায় ওটা করার জন্য প্রক্রিয়া চলছে।’
তিনি বলেন, প্রাণিসম্পদ রক্ষার্থে চুয়াডাঙ্গা জেলায় চাহিদার দশ ভাগ ওষুধ পাওয়া যায়। বাকি ৯০ ভাগ পাওয়া যায় না। ছাগলের কৃমিনাশক ওষুধ গ্রাম পর্যায়ে উঠান বৈঠক ও ছোট সমাবেশ করে ছাগল পালনকারীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়।
তিনি আরো বলেন, ‘প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাবে জেলার সর্বত্র প্রাণী চিকিৎসা দেওয়া যাচ্ছে না। তবে আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

আরও পড়ুন