বাংলাদেশ সীমান্তে নজিরবিহীন সতর্কতা ও নজরদারি ভারতের

আপডেট: 01:35:07 10/07/2016



img
img
img

স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশ সীমান্তে স্মরণকালের সবোর্চ্চ সতর্কতা ও নজরদারি চালাচ্ছে বিএসএফ। বাড়ানো হয়েছে লোকবল ও অস্থায়ী চৌকি। আনা হয়েছে নাইটভিশন ক্যামেরা। বসেছে সিসি টিভি। সেদেশের পুলিশও সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে অস্থায়ী ওয়াচ টাওয়ার বসিয়েছে।
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার কূটনৈতিক জোন হওয়ায় সুরক্ষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত গুলশানে জঙ্গি হানা ও দেশের বৃহত্তম ঈদ জামাতের কাছে পুলিশে ওপর হামলার ঘটনার পর বৃহৎ প্রতিবেশী ভারত এই নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের সব জেলা প্রশাসনকে জরুরি বার্তা পাঠিয়ে সীমান্ত-লাগোয়া থানাগুলোর নিরাপত্তা বাড়াতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তবে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষায় দায়িত্বরতরা বলছেন, ‘সীমান্ত পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক আছে। আমাদের কাছে ওপর মহলের বিশেষ কোনো নির্দেশনাও নেই। আর ওপারে কী হলো না হলো তা আমাদের বিষয় নয়।’
পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট ও সেখানকার সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতার বাড়-বাড়ন্ত ভাবিয়ে তুলেছে সেদেশের কর্তৃপক্ষকে। জঙ্গিরা এদেশ থেকে কোনোভাবেই যেন পশ্চিমবঙ্গে ঢুকে না পড়ে, তার জন্য সতর্কতার মাত্রা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) সদর দপ্তরে থাকা বিশেষ ফোর্সকে সীমান্ত অঞ্চলে পাহারায় নিযুক্ত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে এ ফোর্স দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলসহ উত্তরাঞ্চলের দুই হাজার ২২৬ কিলোমিটার সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে মোতায়েন করা হয়েছে। সেই সঙ্গে ভারতীয় পুলিশও নজরদারি বাড়াতে সে সব সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নেই সেখানে বিএসএফের পাশাপাশি অস্থায় ওয়াচ টাওয়ার বসিয়েছে।
অন্য দিকে বিশ্বে জঙ্গি তৎপরতা যেভাবে বেড়েছে, তা মোকাবিলায় ছেলেমেয়েদের মধ্যে অল্পবয়স থেকে নিজের দেশ সম্পর্কে, মানবজাতি সম্পর্কে আবেগ তৈরির দরকার বলে মনে করছেন নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা। উত্তর ২৪ পরগনার সীমান্ত-লাগোয়া স্কুলগুলোতে যৌথ প্রচারের ব্যবস্থা করছে বিএসএফ এবং পুলিশ।
ওপারের পত্রপত্রিকার খবরে বলা হচ্ছে, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) তাদের সীমান্তে সাধারণ জওয়ান ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সংখ্যা বাড়িয়েছে। ঢাকার গুলশান ট্র্যাজেডির রাত থেকেই বাংলাদেশ সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করে ভারত। তাদের ভাবনায় আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) ছাড়াও পাকিস্তানের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই। যে কারণে ভারত নিজেদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সীমান্তে নিরাপত্তা জনবল, টহল ও চৌকি বাড়িয়ে চলেছে।
এ প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে যশোর ২৬ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশ সীমান্ত শান্ত রয়েছে। সীমান্তে অতিরিক্ত কোনো ফোর্স মোতায়েন করা হয়নি। কিংবা উপর মহল থেকে আমাদের এমন কোনো নির্দেশনাও দেওয়া হয়নি।’
প্রাসঙ্গিক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ওপারে কী অবস্থা তা আমাদের জানা নেই। ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আমরা কিছু বলতে পারব না।’
ওপারের সূত্রগুলো বলছে, ভারতের সন্দেহ সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের পরবর্তী টার্গেট নয়া দিল্লি। যে কারণে দিল্লি নিরাপত্তার দুর্গ নিñিদ্র করার চেষ্টা করছে। একই সূত্র ধরে বাংলাদেশে জঙ্গি হামলার গতিপ্রকৃতিও বোঝার চেষ্টা করছে প্রতিবেশী দেশটি। এজন্য দিল্লির শঙ্কা, বাংলাদেশে একচোট মহড়ার পর ভারতই এই সন্ত্রাস-সিন্ডিকেটের পরের নিশানা।
ভারতীয় গোয়েন্দা সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে সে দেশের পত্রিকাগুলোর খবর, বাংলাদেশে একের পর এক হামলায় আইএস-এর ধাঁচটিও স্পষ্ট হয়ে উঠছে তাদের কাছে। তারা বলছে, আইএস এর মুখপত্র ‘দাবিক’-এ তাদের প্রশাসনিক কর্তা আবু ইব্রাহিম আল হামিদ চলতি বছরের শুরুর দিকে ঘোষণা করেছিলেন, ‘বাংলাদেশে জেহাদ থমকে গিয়েছে। সেখানে আবার নতুন আশার আলো দেখা দেবে।’ তাৎপর্যপূর্ণভাবে বাংলাদেশে যোদ্ধা তৈরি হওয়ার ঘটনাকেও জেহাদের স্বপ্ন পূরণের ধাপ হিসেবে বর্ণনা করেছিল আইএস। যে কারণে ভারত-বাংলাদেশের চার হাজার ৪২৪ কিলোমিটার সীমান্তজুড়ে কড়া নজরদারি শুরু করা হয়েছে।

সীমান্তে এবার নজরদারি পুলিশেরও
বাংলাদেশে একের পর এক জঙ্গি হামলায় উদ্বিগ্ন ওপার বাংলাও। ফলে নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে বিএসএফের পাশাপাশি ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা এলাকায় এবার ওয়াচ টাওয়ার বসাচ্ছে সেদেশের পুলিশও।
চলতি মাসের গোড়ায় ঢাকার গুলশানে স্প্যানিশ রেস্তোরাঁয় হামলা চালায় জঙ্গিরা। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই বৃহস্পতিবার, ঈদের নামাজের আগে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় ফের সন্ত্রাসবাদী হামলায় এক ‘হামলাকারী’সহ চার জনের মৃত্যু হয়েছে। সাত দিনের মধ্যে এমন দুটি ঘটনার পরে কোনও রকম ঝুঁকি নিতে রাজি নয় ভারতীয় পুলিশ ও বিএসএফ।
পশ্চিমবঙ্গের প্রভাবশালী পত্রিকা আনন্দবাজারের খবরে বলা হয়, গুলশানের ঘটনার পরেই রাজ্যের সব জেলাকে ২৪ ঘণ্টা অতি সতর্ক থাকতে বলা হয়েছিল। ওই রাতেই সেই বার্তা জেলাগুলিতে পৌঁছে যায়। আর তারপর থেকেই সীমান্ত এলাকায় নজরদারি আরও বাড়ানো হয়। শনিবার সব জেলার পুলিশ-কর্তাদের সঙ্গে ভিডিও-কনফারেন্স করেন রাজ্য পুলিশের ডিজি সুরজিৎ কর পুরকায়স্থ।
সেখানে পুলিশ সুপারদের মাধ্যমে মূলত সীমান্ত এলাকার সব থানাতেই বাড়তি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সীমান্তের যে সব এলাকায় কাঁটাতার নেই, সেখানে ‘ওয়াচ টাওয়ার’ বসানোর নির্দেশ দিয়েছেন ডিজি। ইতিমধ্যে সীমান্তের কয়েক স্থানে অস্থায়ী টাওয়ার নির্মিতও হয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকায় প্রথমে দু’দফায় তল্লাশি করছে সীমান্ত রক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)। তৃতীয় দফায় তল্লাশির দায়িত্বে রয়েছে পুলিশ।
গত বৃহস্পতিবার পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুলিশের এডিজি (আইন-শৃঙ্খলা) অনুজ শর্মা বলেন, ‘বাংলাদেশ সীমান্তে নজরদারি বাড়াতে পুলিশও ওয়াচ টাওয়ার তৈরি করবে। কোথায় কোথায় টাওয়ারগুলো বসানো হবে সে ব্যাপারেও বিএসএফের সঙ্গে আলোচনা করা হবে।’
নদিয়ার পুলিশ সুপার শীষরাম ঝাঝারিয়া বলেন, ‘জেলার সীমান্ত লাগোয়া ৭টি থানার ওসিদের ইতিমধ্যেই এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সেই মতো কাজও এগোচ্ছে।’
মুর্শিদাবাদের পুলিশ সুপার সি সুধাকরের কথায়, ‘বিএসএফের সঙ্গে আমরাও প্রাথমিক ভাবে কথা বলেছি। সুতি, জঙ্গিপুর, লালগোলা, জলঙ্গিসহ সীমান্তবর্তী বেশ কিছু এলাকায় নজরদারি বাড়াতে ওয়াচ টাওয়ার বসানো হবে। বাংলাদেশ সীমান্তের পাশাপাশি ঝাড়খ- সীমান্তেও একই রকম নজরদারির ব্যবস্থা করা হবে।’
মুর্শিদাবাদ জেলা পুলিশের এক কর্তা বলছেন, ‘এটা অনেকটা দ্বিতীয় ছাঁকনির মতো। বিএসএফের নজর এড়িয়ে কিছু ঘটে গেলে তা আমাদের নজরে পড়ে যাবে।’ তাছাড়া সীমান্তে অনুপ্রবেশ কিংবা পাচারের আগে থাকে একটা দীর্ঘ প্রস্তুুতি। সময়, সুযোগ বুঝে তবেই ঝুঁকি নেয় পাচারকারী কিংবা অনুপ্রবেশকারীরা। সেই ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয় সীমান্তঘেঁষা কোনো গ্রাম। পুলিশের দাবি, বিএসএফ যেহেতু একেবারে সীমান্তে নজরদারি চালায় সেই জন্য লাগোয়া গ্রামগুলিতে তাদের পক্ষে সবসময় তল্লাশি কিংবা নজরদারি চালানো সম্ভব নয়। পুলিশ এবার থেকে সেই কাজটাই করবে।
পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, সীমান্ত-লাগোয়া থানার এক ওসির কথায়, ‘সীমান্তের কোন এলাকা দিয়ে চোরাচালান বেশি হয়, এলাকার কোন বাঁশবাগান কিংবা পাটক্ষেত ব্যবহার করা হয় পাচারের জন্য সে সব খবর আমরাও রাখছি। বিএসএফের সঙ্গে আলোচনা করে সেই সব এলাকাতেই ওয়াচ টাওয়ার তৈরি করা হবে।’’
জেলা পুলিশের এক কর্তার কথায়, ‘২৪ ঘণ্টা এই টাওয়ারের উপর থেকে নজরদারি চালানো হবে। রাতের জন্য থাকবে ড্রাগন লাইট আর নাইট ভিশন ক্যামেরা। নজরদারি চালাতে প্রয়োজনে বিএসএফেরও সহযোগিতাও নেওয়া হতে পারে।’’

দেশকে ভালোবাসো, পড়ূয়াদের শেখাবে পুলিশ ও বিএসএফ
দেশ কি শুধুই ভূগোল বইয়ের পাতায় আঁকা মানচিত্র? নাকি তার আকাশ-বাতাস-মাটি-মানুষ নিয়েই দেশ? দেশপ্রেম কাকে বলে? দেশকে ভালোবাসা যায় কীভাবে? দেশের শক্রই বা কারা? কীভাবে চিহ্নিত করা যাবে তাদের ? এই কথাগুলোই স্কুলের ছেলেমেয়েদের জানাতে উদ্যোগ নিয়েছে ভারতীয় পুলিশ-বিএসএফ। জানাতে চায়, ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের কথা। ভারতের মণীষীদের জীবনের কাহিনী। উদ্দেশ্য একটাই, ছেলেমেয়েদের মধ্যে দেশাত্মবোধ তৈরি। দেশের মানুষের জন্য ভালোবাসার বীজ বপন।
সীমান্তে শুধু পাহারায় অনুপ্রবেশ বা সন্ত্রাসবাদের সমস্যার মোকাবিলা অসম্ভব। চাই শিক্ষা। স্কুল স্তর থেকেই ছেলেমেয়েদের মধ্যে দেশ ও দেশের মানুষের ভালো-মন্দ নিয়ে সচেতনতা তৈরি। বিশ্বে জঙ্গি তৎপরতা যেভাবে বেড়েছে, তার মোকাবিলায় ছেলেমেয়েদের মধ্যে অল্পবয়স থেকে নিজের দেশ সম্পর্কে, মানবজাতি সম্পর্কে আবেগ তৈরির দরকার বলে মনে করছেন নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলায় জড়িত তরুণেরা প্রায় সবাই নামকরা স্কুল-কলেজের ছাত্র, সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট মহকুমার সীমান্ত-লাগোয়া স্কুলগুলোতে যৌথ প্রচারের ব্যবস্থা করছে বিএসএফ এবং পুলিশ। তবে জেলার সীমান্তবর্তী বাকি এলাকাতেও প্রশিক্ষণ চালানো হবে।
পুলিশ সুপার ভাস্কর মুখোপাধ্যায় জানান, সীমান্তবর্তী এলাকায় এ ধরনের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে সীমান্তে যৌথ টহলদারিও শুরু হয়েছে। বুধবার বিএসএফ ও পুলিশের বৈঠক হয়েছে। এসডিপিও শ্যামল সামন্ত জানান, কয়েক দিনের মধ্যেই বসিরহাট মহকুমার সীমান্তবর্তী ছয়টি থানা এলাকার স্কুলে এই প্রশিক্ষণ শুরু হবে।

আরও পড়ুন