প্রজ্ঞাপন অমান্য করে স্কুলে পরীক্ষা, কর্তৃপক্ষ নীরব

আপডেট: 01:44:30 20/04/2017



img

স্টাফ রিপোর্টার : সরকারি প্রজ্ঞাপন ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আদেশ অমান্য করে একের পর এক ঘটনা ঘটিয়ে চলেছেন বেনাপোল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শওকত আলী। ইতিমধ্যে তিনি মডেল পরীক্ষার নামে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছেন দুই লক্ষাধিক টাকা।
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি এ স্কুলের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি হওয়ার পর থেকে ওই শিক্ষক বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। তিনি এখন ধরাকে সরা জ্ঞান করছেন। আর এসব দেখার জন্য যারা দায়িত্বে রয়েছেন তারাও মুখে কুলুপ এঁটেছেন। তার অনিয়মের বিষয়ে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানালে তিনি বিশেষ কারণে এড়িয়ে যান।
সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, মাধ্যমিক স্কুলগুলোতে প্রতি বছর দুটি করে পরীক্ষা নিতে হবে। একটি বার্ষিক, অপরটি অর্ধ-বার্ষিক। এ ছাড়া আর কোনো পরীক্ষা নেওয়া যাবে না। সরকারি এ নির্দেশনা অমান্য করে গত ৫ এপ্রিল বেনাপোল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক স্বাক্ষরিত মডেল পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশ করা হয়। আর এ পরীক্ষা বুধবার (১৯ এপ্রিল) সকাল ১০টা থেকে ১টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে বলে জানানো হয়। পরীক্ষার ফিস বাবদ ষষ্ঠ শ্রেণির তিনটি শাখার ১৮১ জন ছাত্র-ছাত্রীর প্রত্যেকের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে প্রবেশপত্র ফিসহ ১৬৫ টাকা করে। এতে আদায় করা হয় ২৯ হাজার ৮৬৫ টাকা। সপ্তম শ্রেণির তিনটি শাখার ১৩৬ জন ছাত্র-ছাত্রীর প্রত্যেকের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে প্রবেশপত্র ফিসহ ১৮৫ টাকা করে। এতে আদায় করা হয় ২৫ হাজার ১৬০ টাকা। অষ্টম শ্রেণির তিনটি শাখার ১৭৮ জন ছাত্র-ছাত্রীর প্রত্যেকের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে প্রবেশপত্র ফিসহ ১৮৫ টাকা করে। এতে আদায় করা হয় ৩২ হাজার ৯৩০ টাকা।
নবম শ্রেণির বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য শাখার ২৩৭ জন ছাত্র-ছাত্রীদের প্রত্যেকের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে প্রবেশপত্র ফিসহ ২০৫ টাকা করে। এতে আদায় করা হয় ৬৯ হাজার ৮৫ টাকা। দশম শ্রেণির বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য শাখার ২৪৫ জন ছাত্র-ছাত্রীর প্রত্যেকের কাছ থেকে নেওয়া হয়েছে প্রবেশপত্র ফিসহ ২০৫ টাকা করে। এতে আদায় করা হয় ৫০ হাজার ২২৫ টাকা।  সব মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরীক্ষার ফিস বাবদ আদায় করা হয়েছে দুই লাখ সাত হাজার ২৬৫ টাকা। এই বিপুল টাকার বোঝা চেপেছে অভিভাবকদের ঘাড়ে। অন্যান্য স্কুলে এ পরীক্ষার কথা বলা হলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন জারির পর পরই তারা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া ফিস ফেরত দিয়েছে। কিন্তু বেনাপোল মাধ্যমিক বিদ্যালয় ব্যতিক্রম। তারা টাকা ফেরত না দিয়ে নানা কৌশলে পরীক্ষা নিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কৌশল হিসেবে পরীক্ষার সময়সূচিতে সকাল ১০টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত প্রতিদিন একটি বিষয়ের পরীক্ষার কথা বলা হলেও সরকারি কর্মকর্তাদের চোখ ফাঁকি দিতে ছাত্র-ছাত্রীদের বলা হয়েছে সকাল ৮টা থেকে বেলা ১১টা ও সাড়ে ১১টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত প্রতিদিন দুটি বিষয়ে পরীক্ষা নেওয়া হবে। নয় দিনের পরীক্ষা পাঁচ দিনে শেষ করা হবে। ছাত্র-ছাত্রীদের বই-খাতা নিয়ে স্কুল ড্রেস পরে আসতে বলা হয়েছে। যাতে বাইরের কেউ বুঝতে না পারে ভিতরে পরীক্ষা হবে। 
নাম প্রকাশে এক অভিভাবক জানান, ২০১৭ সালের জেএসসি পরীক্ষায় এ স্কুল থেকে ৩২৭ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেয়। এই ৩২৭ জনের মধ্যে মাত্র এক ছাত্রী সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি পেয়েছে। ২১ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা এ স্কুলে থাকার পর পড়াশুনার হাল হচ্ছে এ রকম। এ স্কুলের শিক্ষকরা সারাদিন ব্যস্ত থাকেন রাজনীতি ও আয়বর্ধক কাজকর্ম নিয়ে। দোকান ভাড়ার টাকার হিসেব আর শিক্ষকদের এমপিওভুক্তির আগে-পরে অর্থের হিসেবে তদন্ত করলে সব পরিষ্কার হবে। নানা ফালতু কাজে টাকা খরচ করে তা ছাত্র-ছাত্রীদের কাঁধে চাপানো হয়।
এসব ব্যাপারে কথা হয় প্রধান শিক্ষক শওকত আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘স্কুল পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক মডেল পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে।’
তবে তিনি সরকারি নির্দেশ অমান্য করে পরীক্ষা নেওয়া ও পরীক্ষার ফিস বাবদ টাকা আদায়ের ব্যাপারে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
এ ব্যাপারে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান বলেন, ‘সরকারিভাবে মডেল পরীক্ষার কোনো নিয়ম নেই। আমি কাল স্কুলটিতে যাব। এ রকম পরীক্ষা হলে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট জেলা কর্মকর্তাকে অবহিত করবো।’
তবে বুধবার স্কুলটিতে পরীক্ষা নেওয়া হলেও ওই শিক্ষা কর্মকর্তা সেখানে যাননি।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার আব্দুস সালাম বলেন, ‘মডেল পরীক্ষার নামে যা করা হচ্ছে এটা সম্পূর্ণ বেআইনি। শিক্ষার মান উন্নয়নে আমি নানাভাবে চেষ্টা চালিয়ে আসছি। এটা করতে গিয়ে বিভিন্ন মহলের রোষানলে পড়তে হচ্ছে আমাকে। শিক্ষকরা হচ্ছেন জাতির বিবেক। রাজনীতির মধ্য থেকে বেরিয়ে না এলে শিক্ষার মান উন্নয়ন সম্ভব নয়। তারপরও বিষয়টি আমি দেখবো।’
এ ব্যাপারে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আমিনুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ প্রতিবেদকের কাছে পরীক্ষার সময়সূচি ও কোন কোন ক্লাসের পরীক্ষার জন্য কত টাকা নেওয়া হয়েছে তা জানতে চান। বিষয়টি দেখবেন বলে আশ্বাস দেন তিনি। তবে তার মোবাইল ফোন ও মেইলে তথ্য দেওয়ার পর তিনি আর মোবাইল রিসিভ করেনি, কল ব্যাকও করেননি।

আরও পড়ুন