পিঠে বাণ ফুঁড়ে শূন্যে ঘোরানো হলো ছয় সন্ন্যাসীকে

আপডেট: 10:29:24 16/04/2017



img
img

মহেশপুর (ঝিনাইদহ) প্রতিনিধি : বড়শিতে গাঁথা জ্যান্ত তাজা মানুষ। চড়ক গাছে ঝুলিয়ে প্রায় ২৫-৩০ ফুট শূন্যে ঘোরানো হচ্ছে। সেই অবস্থায় সন্ন্যাসী ভিমকুমার হালদার ভক্তদের উদ্দেশে ছুড়ে দিচ্ছেন বাতাসা।
শুধু ভিম হালদার নন, একে একে ছয় সন্ন্যাসীর পিঠে বড়শি বিঁধে শূন্যে ঘোরানো হলো; যা শিব পূজা বা চড়কের অনুষঙ্গ হিসেবে দীর্ঘদিন পালিত হচ্ছে মহেশপুরের ফতেপুরের বকুলতলায়।
গা শিউরানো এই দৃশ্য দেখতে ও পুজোর প্রসাদ পেতে সেখানে ফি বছর হাজির হন হাজারো মানুষ। এবারো এসেছিলেন অন্তত দশ হাজার নারী-পুরুষ।
মহেশপুর শহর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমের গ্রাম ফতেপুর। এ গ্রামের বকুলতলা বাজারে ভারতীয় পঞ্জিকা মতে ২ বৈশাখ অনুষ্ঠিত হয় চড়কপূজাটি। স্থানীয় হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা এ পুজোৎসবের আয়োজন করে থাকেন। প্রতি বছর এই পূজার মূল আকর্ষণ থাকে ৬-৭ জন সন্ন্যাসীর পিঠে বড়শি বিদ্ধ করে শূন্যে ঘোরানো। এবার ছয়জন সন্ন্যাসী বড়শি (বান) ফোঁড়ালেন ।
স্থানীয়রা জানান, প্রায় দুইশ বছর ধরে চলে আসছে এ চড়কপূজা। আর এ পূজাকে ঘিরে বকুলতলা বাজারে দুইদিন ধরে চলে বর্ণাঢ্য লোকজ মেলা।
বান ফুঁড়িয়ে শূন্যে ঘোরানো দেখতে ও মেলায় কেনাকাটা করতে শুক্রবার সকাল থেকেই লোকজন আসতে থাকেন ফতেপুরে। দুপুরের পর থেকেই ভিড় বাড়তে থাকে মেলা প্রাঙ্গণে। বিকেলের মধ্যে লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় পুরো এলাকা। এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ। ঠিক বিকেল ৫টায় ছয় সন্ন্যাসী বৈচিতলা গ্রামের ভিমকুমার হালদার, জলিলপুর গ্রামের আনন্দ শর্মা, ফতেপুর গ্রামের মনা কর্মকার, বিপ্লবকুমার, কৃশচন্দ্রপুর গ্রামের সাধনকুমার, বাসুদেব কুমার এবং প্রবীণকুমার ফতেপুর বাঁওড়ে স্নান করেন। এরপর ৬ সন্ন্যাসী মাটির কলসে জল ভরে মাথায় নিয়ে আসেন মেলা প্রাঙ্গণে চড়কগাছের (লম্বা মৃত গাছ) গোড়ায়। ৫টা ২০ মিনিটে প্রথমে ভীম হালদারের পিঠে দুটি বড়শি বিদ্ধ করা হয়। এ সময় স্মরণ করা হয় মহাদেবকে (দেবতা শিব)। এরপর ভীমকে ১০-১৫ জন ধরাধরি করে ঝুলিয়ে দেন চড়কগাছে। গাছের অপর প্রান্তে থাকা কপিকলের বাঁশ জোরে ঘোরাতে থাকেন ২০-৩০ জন যুবক। চড়কগাছে লটকে দেওয়ার সাথে সাথে কিছু মহিলা তাদের এক-দেড় বছরের শিশুসন্তানকে তুলে দেন সন্ন্যাসীদের কোলে। তাকে নিয়েই শূন্যে ঘুরতে থাকেন সন্ন্যাসীরা। এ অবস্থায় ছিটিয়ে দেওয়া হয় বাতাসা।
এভাবেই বড়শিতে বিঁধে ৪-৫ সন্ন্যাসী পাক শূন্যে ঘুরে নেমে আসেন ভীম হালদার। এ নিয়ে ১৫ বার চড়কগাছে চড়লেন তিনি।
ভীম হালদার জানান, এখানে হিন্দুর সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। কিন্তু সবাই চড়ক গাছে উঠতে পারে না। এতে উঠতে গেলে মনের অনেক সাহস লাগে।
ভীমের পর একে একে বান ফোঁড়ালেন আনন্দ শর্মা, মনা কর্মকার, বিপ্লবকুমার, সাধন কুমার ও বাসুকুমার।
স্থানীয়রা জানান, আগে শুধুমাত্র পিঠে বাণ ফুঁড়িয়েই ঝুলিয়ে দেওয়া হতো চড়কগাছে। আর সে অবস্থাতেই ঘোরানো হতো। প্রায় ১০৫ বছর আগে এক সন্ন্যাসীর পিঠের চামড়া ছিড়ে পড়ে আহত হওয়ার কারণে বড়শির ওপর এখন গামছা পেঁচিয়ে দেওয়া হয়।
সন্ন্যাসী মনা কর্মকার বলেন, ‘শিব ঠাকুরের সন্তুষ্টির জন্যই আমরা প্রতিবছর চড়কগাছে চড়ে থাকি। শরীরে বড়শি বিঁধার কারণে বড় ধরনের ক্ষতের সৃষ্টি হলেও সামান্যই রক্ত বের হয়। কিন্তু এর জন্য কোনো ওষুধ লাগে না। চড়কগাছ থেকে নামিয়ে গাছের গোড়ায় থাকা সিঁদুর টিপে দিলেই হয়।’
সন্ন্যাসীরা জানান, পূর্ব পুরুষদের কাছে শুনেছেন ২০০ বছর আগে এখানে চড়কপূজা শুরু হয়। আগে কপোতাক্ষ নদের পাড়ে এ পূজার আয়োজন করা হতো। সেই স্থানে আশ্রয়ণ প্রকল্প গড়ে তোলায় এখন ফতেপুর বকুলতলার বাজারে চড়কপূজা হয়।
এ পূজাকে ঘিরে বসে জমজমাট মেলা। লোকজ ঐতিহ্যের হরেক রকম পসরা সাজিয়ে দোকানিরা বেচাকেনা করেন দুই দিন ধরে।
মিষ্টির দোকানি মোসলেম আলী ১০-১২ রকমের মিষ্টি সাজিয়ে বিকিনিকি করছেন। তিনি এবার দশম বারের মতো মেলায় এসেছেন। বেচাকেনা বেশ ভালোই হচ্ছে বলে জানান।
কুষ্টিয়ার একতারপুরের শাঁখা-সিঁদুর বিক্রেতা বিমল সরকারও একই অভিমত দিলেন।
পূজা ও মেলা কমিটির সভাপতি সুনীল ঘোষ ও সাধারণ সম্পাদক সুবল কর্মকার জানান, চড়কপূজা মূলত শিবপূজারই অংশবিশেষ। নানা আনুষ্ঠানিকতায় তা সম্পন্ন করা হয়।