পানীয় জলের জন্য উপকূলজুড়ে হাহাকার

আপডেট: 03:39:23 22/03/2019



img

সামিউল মনির, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) : ‘বিষ্টির পানি শেষ হয়েছে আরো আগে। গত দুই মাস ধরে পুকুরের পানি খাচ্ছি। কিন্তু পানি কমে যাওয়ায় এখন ঘোলা আর দুর্গন্ধযুক্ত পানি খেয়ে প্রাণে বাঁচতেছি’- কথাগুলো উপকূলবর্তী শ্যামনগর উপজেলার খাগড়াঘাট গ্রামের ষাটোর্ধ্ব নারী আমিরণ বিবির।
তার সঙ্গে থাকা গৃহবধূ তাসলিমা বেগম জানালেন, তিন কিলোমিটার দূরবর্তী কাশিপুর গ্রাম থেকে খাওয়ার পানি নিতে এসেছেন তিনি। সাত সদস্যের পরিবারের জন্য সকাল-বিকেল দুইবার তাকে এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ব্যবহার অযোগ্য পানি টেনে নিতে হয় খাওয়ার জন্য।
এমন দৃশ্য কেবল খাগড়াঘাট গ্রামে নয়, বরং শ্যামনগর উপজেলার হেঞ্চি, তালবাড়িয়া, কাঁঠালবাড়িয়াসহ গোটা উপকূলীয় জনপদজুড়ে। সুপেয় পানির জন্য রীতিমতো হাহাকার চলছে।
স্থানীয়দের দাবি, উপকূলীয় এ জনপদে গভীর/অগভীর নলকূপ সফল না হওয়া, আরডবিøউএইচ, পিএসএফসমূহ যথাযথভাবে কাজ না করাসহ নানা কারণে এলাকাবাসীর খাবার পানির প্রধান উৎস বৃষ্টির পানি।
কিন্তু বছরের অর্ধেকটা সময় বৃষ্টির পানি দিয়ে চললেও বাকি সময় তারা পুকুরের পানি ব্যবহার করতে বাধ্য হন। কিন্তু দিনে দিনে পুকুরের পানিও কমে যাওয়ায় এখন কর্দমাক্ত আর দুর্গন্ধময় পানিই তাদের একমাত্র ভরসা।
এদিকে খাবার পানি নিয়ে উপকূলবাসীর দীর্ঘদিনের সমস্যা নিরসনে এক বছর আগে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে পুকুর/দীঘি/জলাশয় পুনঃখনন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।
তবে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরসমূহের সমন্বয়হীনতার কারণে খুবএকটা সুফল মেলেনি। পানি সংরক্ষণসহ নিরাপদ পানি সরবরাহের লক্ষ্যে গৃহীত ওই পরিকল্পনা শুরুতেই হোঁচট খেতে বসেছে।
যদিও কর্তৃপক্ষের দাবি, দুই-একটি স্থানে সমস্যা হলেও দ্রুতই বাকি প্রকল্পগুলো পুরোপুরি কার্যাদেশ অনুযায়ী সম্পন্ন হবে।
ভেটখালী গ্রামের সুষমা মণ্ডল ও সুধারানি জানান, ঘূর্ণিঝড় আইলার পর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরের শেখবাড়ির দীঘি থেকে তারা গোটা গ্রীষ্মকালজুড়ে খাবার পানি সংগ্রহ করতেন। তিন/চার বছর আগে বিদেশি সংস্থা জাইকার পক্ষে স্থানীয় ঈশ্বরীপুর ডেভলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (আইডিএফ) রাস্তাজুড়ে পাইপযোগে বসতবাড়ির সামনে পানি টেনে আনার ব্যবস্থা করে। কিন্তু এক বছরের মধ্যে পাইপসহ যাবর্তীয় সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন আবার প্রখর রোদের মধ্যে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। তবে গত কিছুদিন ধরে পুকুরের পানি কমে যাওয়ায় এখন কাদাযুক্ত পানি খেতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। গরম বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পানি লবণাক্তও হয়ে যাচ্ছে।
কাঁঠালবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা শিক্ষক সুভাষ মণ্ডল এবং মুজিবর রহমানসহ স্থানীয়রা জানান, খুঁটিকাটা, কাঁঠালবাড়িয়া, কাছিহারানিসহ পাঁচ গ্রামের মানুষের গ্রীষ্মকালের একমাত্র পানির উৎস কাঁঠালবাড়িয়া সরকারি দীঘি। কিন্তু এটি খননের জন্য পানি উত্তোলন করায় এখন সাত-আট কিলোমিটার দূরবর্তী বিভিন্ন পুকুর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দূরত্ব ভেদে কলস প্রতি দশ থেকে ত্রিশ টাকা পর্যন্ত মজুরি দিয়ে পানি সংগ্রহ করতে হয় বাসিন্দাদের।
গ্রামাঞ্চল আর প্রত্যন্ত জনপদে বসবাস করেও টাকা দিয়ে পানি কিনে খাওয়ার বিষয়ঠি জানান ছোটকুপোট, আটুলিয়াসহ আরো অনেক গ্রামের শ্রমজীবী মানুষ। তাদের ভাষ্য, ভাত রুটি না খেয়েও এক বেলা থাকা যায়। কিন্তু পানি ছাড়া এক মুহূর্ত কাটে না। জীবন বাঁচাতে বাধ্য হয়ে প্রতি কলস পানি ২০-৩০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পুকুরের কর্দমাক্ত, দুর্গন্ধময় আর লবণপানি পান করতে বাধ্য হচ্ছেন বলেও জানান তারা।
কাঁচড়াহাটি গ্রামের প্রভাষ মণ্ডল দিনমজুরের কাজ করেন। কিন্তু এলাকার পুকুরের পানি কমে গন্ধ আর ঘোলা হয়ে যাওয়ায় এখন তাকেও টাকা দিয়ে পানি কিনে পান করতে হচ্ছে। পানের উপযোগী পানির জন্য তারা গ্রীষ্মের শুরু থেকেই লড়াই করছেন।
উপকূলবাসীর খাবার পানির এ সমস্যা দীর্ঘদিনের। সমস্যা নিরসনে এক বছর আগে প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্পের আওতায় পুকুর/দীঘি/জলাশয় পুনঃখনন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। যার অংশ হিসেবে উপকূলীয় এ জনপদে প্রথম পর্যায়ে ৫৭টি পুকুর পুনঃখননের সিদ্ধান্ত হয়। যেখানে ন্যূনতম ১৯ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ৬৮ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় ধরা হয়েছে প্রতিটি পুকুরের জন্য।
এদিকে পানের উপযোগী পানির সমস্যা নিরসনে গৃহীত এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের শুরুতে বিপত্তি দেখা দিয়েছে। জেলা পরিষদের পুকুর দাবি করে প্রকল্প বরাদ্দ দেওয়ার পর কিছু পুকুরের মালিকানা দাবি করেছেন স্থানীয়রা। তাদের বক্তব্য, ভুল তথ্যের ভিত্তিতে জেলা পরিষদ তাদের পৈত্রিক পুকুরকে সরকারি পুকুর উল্লেখ করে প্রস্তাবনা পাঠায়। ফলে সরকারি উদ্যোগে এসব পুকুর পুনঃখনন নিয়ে সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঠিকাদার নিয়োগের পরও ভুরুলিয়ার কাটিবারহল গ্রামে ১৬১ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়-সংলগ্ন পুকুরটির খনন কাজ শুরতেই বন্ধ হয়ে গেছে। জেলা পরিষদ ওই পুকুর নিজেদের দাবি করে পুনঃখননের প্রস্তাবনা পাঠালেও স্থানীয় কিছু লোক দাবি করেছেন, এটা তাদের পৈত্রিক পুকুর।
বিদ্যালয়টির পরিচালনা কমিটির সভাপতি শেখ মহিউদ্দীন জানান, জেলা পরিষদ শুরুতে এটি তাদের পুকুর বলে দাবি করলেও কাগজপত্র দেখে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে গেছে। ভুল তথ্যে জেলা পরিষদ ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর ওই পুকুর সরকারি তালিকাভুক্ত করেছিল।
প্রায় অভিন্ন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে কৈখালীর খোসালপুর সরকারি দীঘিকে কেন্দ্র করে। জেলা পরিষদ সম্প্রতি সেখানে কাজ শুরু করলেও জনৈক আশেক এলাহী পুকুরটি নিজের দাবি করায় সেখানকার খনন কাজও বন্ধ হয়ে গেছে।
একইভাবে নুরনগরসহ আরো কয়েকটি এলাকায় সরকারি দীঘি নির্ধারণ নিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে মতপার্থক্যের কারণে আপাতত সেসব এলাকায় সরকারি উদ্যোগে পুকুর খননের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে পানযোগ্য পানি নিয়ে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা শুরুতেই হোঁচট খেয়েছে বলে জানান কৈখালীর ইউপি সদস্য অসীমকুমার মণ্ডল, কাটিবারহল বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান।
এদিকে সরেজমিনে কাঁঠালবাড়িয়া সরকারি দীঘি পরিদর্শনে দেখা গেছে, অনিয়মের মধ্যেই শুরু হয়েছে পুকুর পুনঃখনন প্রকল্পের কাজ। কাজ শুরুর তারিখ থেকে সম্পন্ন হওয়ার মেয়াদকাল এমনকি কাজের ধরন কিংবা প্রাক্কলিত ব্যয়সহ কোন ধরনের তথ্যসংবলিত সাইনবোর্ড সেখানে লাগানো হয়নি।
জানা যায়, পুকুরটি আগেকার পাড় থেকে ১৮ ফুট গভীর হওয়ার কথা। কিন্তুদেখা গেছে, পাড়ের ওপর দুই-তিন ফুট মাটি ফেলে ঐ গভীরতা অক্ষুণ্ন রাখার চেষ্টা হয়েছে।
স্থানীয় গ্রামবাসী অনিল মণ্ডল, সুধাংশু ও আব্দুর রশিদ জানান, কত টাকা বরাদ্দ কিংবা কাজের মেয়াদকাল সম্পর্কিত বিষয়াবলীসহ কোনো বিষয়ে সাইনবোর্ড না থাকায় তাদের কাছে কোনো কোনো তথ্য নেই। উদ্বোধনের সময় এলাকাবাসীর পানযোগ্য পানির সমস্যা দূর করতে পুকুরটি পুনঃখননের কথা তাদের জানানো হয়েছে।
তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় কয়েক গ্রামবাসী জানান, প্রায় ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ে পুকুরটি পুনঃখননসহ সেখানে সৌন্দর্যবর্ধণের বিষয়ে তারা জেনেছেন। কিন্তু পরে প্রকল্পের বিষয়ে আর কিছু তাদের জানানো হয়নি।
উপজেলা সহকারী জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, এই অঞ্চলের শতকরা প্রায় ৭০ ভাগ মানুষ পুকুরের পানি পান করে থাকেন। স্যালাইন এলাকা হওয়ায় গ্রীষ্মকালে পুকুরের পানি কমে যাওয়ায় সংকট প্রবল আকার ধারণ করে। তবে সরকারিভাবে ট্যাংকি সরবরাহ করে বৃষ্টির সময়কার পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে স্থানীয়দের সারা বছরের জন্য পানির চাহিদা পূরণের চেষ্টা চলছে।
তিনি আরো বলেন, ‘এক হাজার ৬৩৮টি গভীর এবং ৩৫৮টি অগভীর নলকূপ ছাড়াও ৩৯৭টি ভিএসএসটি, ৪৮৩টি এসএসটি, এক হাজার ৯৮টি আরডাব্লিউএইচ এবং ৫৬৬টি পিএসএফের মাধ্যমে স্থানীয়দের পানির চাহিদা মেটানোর চেষ্টা চলছে। এছাড়া জেলা পরিষদের পুকুরসমূহ পুনঃখননের পাশাপাশি ব্যক্তি উদ্যোগে নতুন নতুন পুকুর খননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

আরও পড়ুন