পাইকগাছায় আশ্রয়ণ প্রকল্প ছাড়ছেন বাসিন্দারা

আপডেট: 06:41:34 14/06/2018



img

এস এম আলাউদ্দিন সোহাগ, পাইকগাছা (খুলনা) : পাইকগাছায় ছিন্নমূল ভ‚মিহীন পরিবারের ঠাঁই আশ্রয়ণ প্রকল্পগুলো নানা সংকটে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বেশিরভাগ প্রকল্প যোগাযোগবিচ্ছিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠায় এবং শুরু থেকে পানীয় জল, বিদ্যুৎ, ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখার জন্য বিদ্যালয় না থাকায় বাসিন্দারা বাধ্য হয়ে চলে যাচ্ছেন অন্যত্র। অনেক পরিবার ঘর বরাদ্দ নিয়েও বেশ আগে থেকেই বসবাস করছেন অন্যখানে।
যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন প্রকল্পবাসীদের অনেকে ক্ষোভের সাথে বলেন, তাদের প্রকল্পগুলো সভ্যতার আলো থেকে দূরে অবস্থিত।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বলছেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পগুলো নির্মাণে পরিকল্পনাহীনতা ও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবই এমন অবস্থার জন্য দায়ী। সুবিধাবঞ্চিত পরিবারগুলোর দাবি, প্রকল্পের লক্ষ ও উদ্দেশ্যকে ত্বরান্বিত করতে সেগুলো বসবাসের উপযোগী করে তোলা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ভ‚মিহীন, দুস্থ ও অসহায় মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছে দেশজুড়ে গড়ে তোলা আশ্রয়ণ প্রকল্পগুলোতে। পাইকগাছা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ১৯৯৯ সাল হতে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ২৮টি আশ্রয়ণ প্রকল্প, গুচ্ছ ও আদর্শ গ্রামে ভ‚মিহীনদের পুনর্বাসন করেছে সরকার। এসব প্রকল্পে ১৪৪টি ব্যারাক ও এক হাজার ৫৩০টি ঘর রয়েছে। সেখানে বসবাস করছেন এক হাজার ২৪৭টি পরিবার। বাকি ৩৩৩টি ঘর সমসংখ্যক পরিবারকে বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেখানে বসবাস করছে না কেউ।
সূত্র জানায়, প্রকল্পগুলোর মধ্যে আশ্রয়ণ প্রকল্প রয়েছে তিনটি, আশ্রয়ণ প্রকল্প (ফেইজ-২) ১৫টি, গুচ্ছগ্রাম পাঁচটি, আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প একটি এবং আদর্শ গ্রাম রয়েছে তিনটি। আশ্রয়ণ প্রকল্পগুলো হলো, বাইশারাবাদ, গড়ইখালী ও দেবদুয়ার। আশ্রয়ণ প্রকল্প (ফেইজ-২) হচ্ছে, কলমিবুনিয়া, রাড়–লী খেয়াঘাট, আলোকদিয়া, বিল পরানমালী, সরল চর কপোতক্ষী, গড়ইখালী, নুরপুর, আমিরপুর, কুমখালী, পুটিমারী, হেতালবুনিয়া, হাচিমপুর, চাঁদখালী, চক চাঁদমুখী, হরিখালী ও পতন। গুচ্ছগ্রামগুলো হচ্ছে, সোলাদানা, কাওয়ালী, কাটাবুনিয়া, পতন বেতবুনিয়া ও খড়িয়া। আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প হচ্ছে, বেতবুনিয়া। আদর্শ গ্রাম তিনটি হচ্ছে, বয়ারাঝাপা, পাইকগাছা ও ভৈরবঘাটা।
তিনটি আশ্রয়ণ প্রকল্পে ২৬টি ব্যারাকে ২৬০টি ঘরের মধ্যে ১৭৩ পরিবার বসবাস করছে। খালি রয়েছে ৮৭টি ঘর। আশ্রয়ণ প্রকল্প (ফেইজ-২) এর ১৫টি প্রকল্পে নয়টি ব্যারাকে ৯২০টি ঘরের মধ্যে ৭৫৬টি পরিবার বসবাস করছে। খালি রয়েছে ২১৪টি ঘর। চারটি গুচ্ছগ্রামে ১৬০টি ঘরের মধ্যে ১৩০ পরিবার বসবাস করছে। খালি রয়েছে ৩০টি। আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের ১৪ ব্যারাকে ৭০টি ঘরের মধ্যে ৬৮টি পরিবার বসবাস করছে। খালি রয়েছে দুটি। তবে তিনটি আদর্শ গ্রামে ১২টি ব্যারাকে ১২০টি ঘরের মধ্যে ১২০টি পরিবার বসবাস করছে।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, বেশিরভাগ আশ্রয়ণ প্রকল্প নির্মাণ করা হয়েছে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অথবা নদীর চরভরাটি এলাকায়। সেক্ষেত্রে অধিকাংশ প্রকল্পে যাতায়াতের তেমন কোনো রাস্তা নেই। বেশিরভাগ প্রকল্প এলাকায় সেখানকার ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখার জন্য নেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এছাড়া প্রকল্পের বাসিন্দাদের অধিকাংশই শ্রমজীবী। কিন্তু সমাজবিচ্ছিন্ন এলাকায় অবস্থান হওয়ায় সেখানে কাজের তেমন ব্যবস্থা নেই। এসব সংকটে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ব্যারাক ছেড়ে অন্যখানে চলে যাচ্ছে অনেক পরিবার। বিশেষ করে উপজেলার বাইশারাবাদ, কলমিবুনিয়া, আলোকদিয়া, বিল পরানমালী, হেতালবুনিয়া, হরিখালী, গাংরখী প্রকল্পগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ। দুর্গম এলাকা হওয়ায় এসব প্রকল্পে এখনো পৌঁছেনি বিদ্যুতের আলো। গড়ে ওঠেনি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ফলে সেখানে বেড়ে ওঠা বাচ্চারা বঞ্চিত হচ্ছে শিক্ষা থেকে।
বাসিন্দারা জানান, এমনকি এসব প্রকল্পের কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তো দূরের কথা, নেই কোনো হাট-বাজারও।
গড়ইখালীর গাংরখী আশ্রয়ণ প্রকল্পের সভাপতি শচীন সরদার বলেন, দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় বেশিরভাগ ঘর জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। নানা সংকটে ঘরগুলো কার্যত বসবাসের অনুপযোগী হয়ে গেছে।
সরল আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাক্কার মিস্ত্রি জানান, প্রকল্পের প্রায় সব ঘরের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। বিশেষ করে প্রকল্পে পানীয় জল ও টয়লেটগুলো ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে রোগ-জীবাণু ছড়াচ্ছে।
প্রকল্পের বাসিন্দা ইউছুপ আলী বলেন, তাদের প্রকল্পে যাতায়াতের জন্য রাস্তা নেই। জীবনের প্রয়োজনে বর্ষা মৌসুমে বাধ্য হয়ে হাঁটু পর্যন্ত কাদা পার হয়ে যাতায়াত করতে হয়। তাদের প্রকল্প এলাকার কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে গড়ে ওঠেনি কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও।
এ প্রসঙ্গে গড়ইখালী ইউপি চেয়ারম্যান রুহল আমিন বিশ্বাসের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, গড়ইখালী বাজার-সংলগ্ন আশ্রয়ণ প্রকল্পটি নদী ভাঙনের হুমকির মুখে রয়েছে অনেকদিন। ভাঙনরোধে এখানই ব্যবস্থা না নেওয়া হলে যে কোনো সময় পুরো প্রকল্প গিলে খাবে প্রমত্তা শিবসা।
পাইকগাছা উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট স ম বাবর আলী বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পগুলোর জায়গা নির্ধারণে সুষ্ঠু পরিকল্পনার যথেষ্ট অভাব ছিল। বেশিরভাগ প্রকল্প গড়ে উঠেছে বেড়িবাঁধের বাইরে। ফলে বর্ষা মৌসুম ও অতিরিক্ত জোয়ারে ডুবে যায় অনেক প্রকল্প এলাকা। দীর্ঘদিনেও বসবাসের উপযোগী পরিবেশ গড়ে তোলার ব্যর্থতায় বাসিন্দাদের অনেকেই ব্যারাক ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে।
তবে স্ব-স্ব ইউপি চেয়ারম্যানরা সহযোগিতা করলে আগামীতে প্রকল্পগুলো বাসিন্দাদের বসবাসের উপযোগী করা সম্ভব।
পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফকরুল হাসান বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের উন্নয়নে তাদের বিশেষ কোনো সুযোগ নেই। তবে কোনো প্রকল্পে বড় ধরনের সমস্যা দেখা দিলে এবং তা তাদের অবহিত করলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষর মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

আরও পড়ুন