নড়াইলে ‘মুক্তিযোদ্ধা বানাতে’ বিস্তর ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ

আপডেট: 12:48:40 16/03/2017



img

রূপক মুখার্জি, লোহাগড়া (নড়াইল) : সরকারিভাবে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই বাছাই বন্ধ হওয়ার আগে গত কয়েকদিনে নড়াইল সদরের অনলাইনে নাম অন্তর্ভুক্তি ও মুক্তিযোদ্ধা বানাতে অন্তত ২৫ জনের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের দপ্তর সম্পাদক মো. নুরুজ্জামানের বিরুদ্ধে।
ইতিমধ্যে তিনি বেশ কয়েকজনের কাছ থেকে নেওয়া ঘুষের টাকা ফেরতও দিয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ মুক্তিযোদ্ধারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নড়াইল সদর উপজেলায় গত ১১ ফেব্রুয়ারি থেকে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই শুরু হলেও কমিটি নিয়ে আপত্তির কারণে তা পিছিয়ে যায়। পরবর্তী ঘোষণা অনুযায়ী ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ মার্চ পর্যন্ত সদরের ১৩ ইউনিয়ন এবং এক পৌরসভার মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভূক্তির জন্য অনলাইনে আবেদন করা ৩৯৬ জন মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকার গ্রহণের ঘোষণা দেওয়া হয়। এই ঘোষণার পর থেকেই রূপগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয়ে বসে তিনি নানা ধরনের জালিয়াতি করতে থাকেন। এসময় অন্তত ২৫ জনের কাছ থেকে তিনি বিপুল টাকা ঘুষ নিয়েছেন।
সূত্র জানায়ম ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে কালিয়া উপজেলার বড়দিয়া চোরখালী গ্রামের জনৈক শেখ হারিচউদ্দীনকে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম ওঠানোর জন্য দুই লাখ টাকায় রফা করেন নড়াইল জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের এই নেতা। এর মধ্যে ১৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে ২৫ হাজার টাকাও প্রদান করেন হারিচউদ্দিন। এই টাকা দিয়ে কাজ হবে কিনা এ ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হারিচউদ্দিন ১৭ ফেব্রুয়ারি নুরুজ্জামানের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। এই ফোনালাপ সাংবাদিকদের কাছে এসে যাওয়ায় উল্টো নুরুজ্জামান তাকে মানহানির মামলার ভয় দেখিয়েছেন বলে হারিস শেখ জানিয়েছেন।
নড়াইল সদরের ভদ্রবিলা ইউনিয়নের পলইডাঙ্গা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মৃত কাজী আশরাফের মুক্তিযোদ্ধা সনদের জন্য অনলাইনের খরচ বাবদ ১৫ হাজার, জামুকা সনদের জন্য দশ হাজার এবং মুক্তিযোদ্ধা সনদের জন্য দুই লাখ টাকা চুক্তিতে স্থানীয় একজন কমান্ডারের মাধ্যমে ২৫ হাজার টাকা অগ্রিম গ্রহণ করেন। যাচাই বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ১০ মার্চ ওই কমান্ডারের কাছে ১৫ হাজার টাকা ফেরত দিতে চাইলে তিনি নিতে অস্বীকৃতি জানান। ১১ মার্চ ২৫ হাজার টাকাই ফেরত দিতে বাধ্য হন নুরুজ্জামান।
একইভাবে নুরুজ্জামান নড়াইল কোর্ট চত্বরের একজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে দুই লাখ ২৫ হাজার টাকার চুক্তিতে ২৫ হাজার টাকা নেন অনলাইন আর জামুকা সনদের জন্য। তিনি নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, ‘যাচাই বাছাই বন্ধ হবার পরে কয়েকদিন ঘোরাঘুরি করে নুরুজ্জামান ভাই আমার টাকা ফেরত দিয়েছে।’
মুক্তিযুদ্ধকালীন বিএলএফ ক্যাম্প কমান্ডার সাইফুর রহমান হিলু বলেন, ‘নুরুজ্জামান নানা জায়গা থেকে টাকা গ্রহণ করেছে এটা সত্য। সে একা না, তার সাথে আরো লোক যুক্ত আছে। অনেকের টাকা ফেরত দিচ্ছে এটা শুনেছি। সে যখন হুমায়ুন শরীফের (যুদ্ধকালীন কমান্ডার) কাছ থেকে টাকা নিতে পারে তাহলে কাউকেই বাদ দেয়নি। এরা নব্য রাজাকার। এদের এসব কর্মকা-কে অবশ্যই জবাবদিহিতার আওতায় আনবে জেলা কমান্ড কাউন্সিল।’
মুক্তিযুদ্ধকালীন বিএলএফ নড়াইল সদর মহকুমা কমান্ডার ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শরীফ হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘নড়াইল সদরের মুক্তিযোদ্ধা বাছাইয়ে অনেক অনিয়মের খবর পেয়েছি। আমার সামনে পলইডাঙ্গা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মৃত কাজী আশরাফের কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকা গ্রহণ করে পরে তা ফেরত দিয়েছে নুরুজ্জামান। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এগুলো একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
অভিযোগ বিষয়ে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের দপ্তর সম্পাদক মো. নুরুজ্জামান বলেন, ‘এ সবই মিথ্যা কথা। আমার ইমেজ নষ্ট করা জন্য করা হচ্ছে। আমি তো ফরমও বিনা পয়সায় পূরণ করে দিচ্ছি।’
টাকা চাওয়ার কথোপকথনের ভয়েস রেকর্ড রয়েছে জানালে তিনি বলেন, ‘ও ভয়েস আমার না।’
এ ব্যাপারে জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এম এম গোলাম কবীর বলেন, ‘আমি এ বিষয়গুলো জানি না। আমি লোহাগড়ার বিষয় নিয়ে ব্যস্ত আছি। নড়াইল সদরের ব্যাপারে যারা কমিটিতে আছে তারাই ভালো জানেন।’

আরও পড়ুন