নিহত অপু আজো জীবিত বাবা-মা-বোনের হৃদয়ে

আপডেট: 01:47:18 08/07/2016



img
img

চন্দন দাস, বাঘারপাড়া (যশোর) : ‘ঈদের দিন খুব সকালে ঘুম থেকে উইঠে ছেলেডা আমাগের সালাম করতো। এরপর গোসল কইরে ওর বাবার সাথে যাতো নামাজ পড়তি। নামাজেরতে আইসে বলতো মা খাতি দেও। আমি আগে সেমাই খাতি দিতাম। ঈদের দিন ও খুব মজা করতো। হৈ-হুল্লোড় কইরে মাতায় তুলতো সারা বাড়ি। এবার আর আমার বাবা সালাম করবে না। করবে কীভাবে? ওরাতো আমার ছেলেডারে মাইরে ফেলিছে। আমাগের আবার ঈদ কীসির?’
কথাগুলো বলেই কান্না জুড়ে দিলেন এলিজা বেগম। তিনি লিজন আহমেদ অপুর মা। গত ৬ জুন বাঘারপাড়ার চাড়াভিটায় ফিলিং স্টেশনে দুর্বৃত্তরা খুন করে রঘুনাথপুর গ্রামের ছদর উদ্দিনের ছেলে লিজন আহমেদ অপুকে। একই সঙ্গে খুন হন ওই পাম্পের ম্যানেজার ওবায়দুর রহমান।
ঘটনার এক মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো স্বাভাবিক হতে পারেননি অপুর বাবা-মা। একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে শোকের সাগরে ভাসছে পরিবারটি।
অপুর একমাত্র ছোট বোন লামিয়ার মনেও নেই ঈদের আনন্দ। চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী লামিয়ার সবকিছু বোঝার বয়স হয়নি এখনো। ও শুধু বোঝে একমাত্র ভাই তাদের মাঝে আর কোনো দিন ফিরে আসবে না। এনে দেবে না এত্ত এত্ত ফুল, হাতে পরিয়ে দেবে না মেহেদি কিংবা আর কোনোদিন নিয়ে যাবে না ঘুরতে।
ভাইয়ের স্মৃতিচারণ করে কেঁদে ফেলে ছোট্ট লামিয়া। বলে, ‘‘আমার ভাইয়ার মতো ভাইয়া হয় না। ঈদের আগের দিন ভাইয়া আমারে হাতে মেহেদি লাগাই দিত। আমার ভাইয়া নেইতো, তাই এবার মেহেদি লাগিয়ে দিয়েছে আমার ফুফু লিমা। আমার ভাইয়া আমারে খুব ভালবাসতো। দামি ফেসওয়াশ এনে দিয়ে বলতো, ‘এটা ব্যবহার করলে ত্বকের ক্ষতি হয় না।’ ভাইয়া আমারে খুব কেয়ার করতো। শহীদ মিনারে নিয়ে যেত ফুল দিতে। আমার ভাইয়ারে যারা মারিছে তাদের ফাঁসি চাই।’
মৃত ভাইয়ের স্মৃতি বয়ে বেড়ানো ছোট্ট লামিয়ার অগোছালো কথাগুলো শুনে কান্না ধরে রাখতে পারেন না প্রতিবেশীরা।
অপুর মা এলিজা বেগম বলেন, ‘‘অপু নিয়মিত নামাজ পড়তো। অভ্যাস ছিল রোজা রাখারও। এবার ও বলেছিল ‘মা আমি এবার সবগুলো রোজা রাখব।’ কিন্তু রোজা শুরুর একদিন আগেই পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিল অপু।’’
ছেলের স্মৃতি স্মরণ করতে করতে বিলাপ করে কাঁদতে থাকেন এলিজা বেগম। জানান, ঘটনার দিন রাতে পাম্পে শুতে যাওয়ার আগে দুধ-ভাত খেয়ে যায় তার আদরের ধন ছেলে। সেই দুধ-ভাতই হলো মায়ের কাছ থেকে তার শেষ খাওয়া।
অপুর বাবা ছদর উদ্দিন খাঁ বলেন, ‘‘আমার ছেলে ছিল হাজারে একটা। কারো সাথে ঝগড়া-গ-গোল করতো না। ওর মোটরসাইকেল কেনার খুব সখ ছিল। ও বলতো, ‘আমার বোনকে নিয়ে আমি মোটরসাইকেলে ঘুরে বেড়াব।’’
যশোর এমএম কলেজের মাস্টার্স শেষ বর্ষের ছাত্র অপুর ইচ্ছে ছিল ব্যাংকে চাকরি করার। তাইতো বিয়ে করার প্রসঙ্গ তুললে মাকে বলত, ‘আগে চাকরি, তারপর বিয়ে।’
সন্ত্রাসীদের নির্মম অস্ত্র জীবন থেকে কেড়ে নিয়েছে অপুকে। কিন্তু বাবা-মা-বোনের হৃদয়ে অপু আজো জীবিত।

আরও পড়ুন