তারিফের বাড়িতে মাতম, বিল্লালের লাশ এখনো মর্গে

আপডেট: 06:46:13 12/01/2019



img
img

আনোয়ার হোসেন, মণিরামপুর (যশোর) : মণিরামপুরে অপহরণের পর হত্যার শিকার শিশু তারিফের (৯) পরিবারে চলছে মাতম। ছেলে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন বাবা সিদ্দিকুর রহমান। ছেলের ছবি বুকে নিয়ে কাঁদছেন তিনি। একই অবস্থা তারিফের মা রোজিনা বেগমের।
পরিবারটিকে সান্ত্বনা দিতে এলাকাবাসীসহ দূর-দূরান্ত থেকে আসা নারী-পুরুষরা ভিড় জমাচ্ছেন বাড়িটিতে। আত্মীয়-স্বজন বা গণমাধ্যমকর্মীদের দেখলেই কেঁদে ওঠেন সিদ্দিকুর রহমান। দাবি করেন খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি- ফাঁসি।
শনিবার দুপুরে সরেজমিন উপজেলার ফেদাইপুর গ্রামে সিদ্দিকুর রহমানের বাড়িতে এমন চিত্র চোখে পড়ে।
শিশু তারিফ হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা বিল্লাল ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেলেও তার সহযোগী বাবা কাঠু মোস্তফা ও মা মরিয়ম ধরা না পড়ায় এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। বাচ্চাদের নিয়ে উদ্বিগ্ন এলাকার নারীরা। রাত হলেই তাদের আতঙ্ক বেড়ে যায়। বাইরে বেরুতে না দিয়ে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়াচ্ছেন ঘরের মধ্যেই। আবার দিনের বেলায় নিজেরা সঙ্গে করে স্কুলে আনা-নেওয়া করছেন বাচ্চাদের।
তারিফ খুনে প্রধান অভিযুক্ত বন্দুকযুদ্ধে নিহত বিল্লালের বাড়িঘরে আগুন জ্বালিয়ে ও ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় এলাকাবাসী। ঘটনার পর থেকে বিল্লালের বাবা মোস্তফা ওরুফে কাঠু মোস্তফা স্ত্রী মরিয়মকে নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। আর এলাকাবাসীর বাধার মুখে বিল্লালের লাশ গ্রামে এনে দাফন করতে পারছেন না তার স্বজনরা। ফলে বুধবার থেকে তার লাশ যশোর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পড়ে আছে। আজ (শনিবার) বিল্লালের এক মামা তার লাশ গ্রহণের জন্য পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তবে, এলাকাবাসী ‘খুনি’ বিল্লালের লাশ গ্রামে দাফন করতে দেবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন।
সিদ্দিকুর রহমানের বাড়ির পাশেই সরকারি সাত শতক খাস জমিতে পরিবার নিয়ে থাকতেন কাঠু মোস্তফা। জমিজমা না থাকায় স্থানীয় সিলুমপুর বাজারে ভিক্ষুকদের জন্য তৈরি একটি দোকানও পেয়েছিলেন তিনি।
ছেলের খুনের বর্ণনা দিতে গিয়ে ছিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘বিল্লাল ও তার বাবা-মা সবাই বেপরোয়া ছিল। তুচ্ছ কোনো ঘটনায় তারা দা-বটি নিয়ে আমাদের মারতে আসতো। কয়েকদিন আগে বিল্লাল আমাদের পুকুর থেকে চুরি করে আড়াই কেজি মতো মাছ ধরে। যা দেখে ফেলে তারিফ। তারিফ বিষয়টি আমার বাবা মুক্তার গাজীকে বলে দেয়। বাবা এই নিয়ে বকাঝকা করার পর থেকে তারিফের ওপর চটে যায় বিল্লাল। এরপর কৌশলে গত রোববার (৬ জানুয়ারি) বিকেলে তারিফকে রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে যায় বিল্লাল। ওই রাতেই বিল্লাল ও তার মা-বাবা মিলে ঘরের মধ্যে আটকে রেখে মুখে টেপ মেরে বিদ্যুতের শক দিয়ে এবং ঘাড় মটকে আমার ছেলেকে হত্যা করে। ছেলেকে মেরে তারা প্রথমে লাশ ঘরের মধ্যে গর্ত করে পুঁতে রাখতে চেয়েছিল। পরে সেই লাশ বাড়ির অদূরে একটি কালভার্টের মধ্যে বস্তাবন্দি করে ফেলে আসে তারা। খুনের ঘটনা জানাজানি হলে বিল্লালদের ঘরে ঢুকে লেপ-তোষকে রক্ত লেগে থাকতে এবং ঘরের এক কোণে মাটি খোঁড়া দেখতে পেয়েছে এলাকাবাসী।’
এদিকে শিশু তারিফ খুনের ঘটনায় জড়িত নিহত বিল্লালের বাবা-মাকে গ্রেফতার করে ফাঁসিতে ঝোলানোর দাবি এলাকাবাসীর।
মণিরামপুর থানার ওসি সহিদুল ইসলাম বলেন, ‘পারিবারিক কলহের জেরে শিশু তারিফকে অপহরণের পরে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। বিষয়টি নিয়ে অধিকতর তদন্ত করছে পুলিশ। আমরা বিল্লালের বাবা-মাকে গ্রেফতারের চেষ্টা করছি।’
গত রোববার উপজেলার খানপুরের ফেদাইপুর গ্রামের তৃতীয় শ্রেণিপড়–য়া তারিফ হোসেন নিখোঁজ হয়। খোঁজাখুজির একপর্যায়ে স্বজনরা জানতে পারেন, প্রতিবেশী বিল্লাল নামে এক তরুণ তারিফকে অপহরণ করেছে। একপর্যায়ে পাঁচ লাখ টাকাও দাবি করে বিল্লাল। বিষয়টি থানা পুলিশকে জানালে পাশের কেশবপুর উপজেলা থেকে মঙ্গলবার রাতে পুলিশ বিল্লালকে আটক করে।
পুলিশ বলছে, আটক বিল্লাল তার বাবা-মায়ের সহযোগিতায় তারিফকে হত্যা করেছে বলে পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি দেয়। পরে রাত ১১টার দিকে পুলিশ বিল্লালকে সঙ্গে নিয়ে লাশ উদ্ধারে গেলে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় সে। এই ঘটনার পর থেকে বিল্লালের পরিবার বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায়।

আরও পড়ুন