চুরি যখন সরকারি চাকুরের প্রধান কাজ

আপডেট: 04:10:02 29/06/2016



img

আব্দুস সামাদ, সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের স্টোরকিপার এ কে ফজলুল হক দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর তার সম্বন্ধে অজানা নানা কাহিনি বেরিয়ে আসছে। সহকর্মীরা বলছেন, বেতন তাকে টানে না। টানে চুরি। কোটি কোটি টাকার ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নয়ছয় করে বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হয়েছেন এই ব্যক্তি। আর দরিদ্র জনগণ বঞ্চিত হয়েছেন তাদের জন্য বরাদ্দ সরকারি সুবিধা থেকে।
আগের দুর্নীতির দায়ে তার বেতন কেটে রাখা হয় সরকারি কোষাগারে। টাকা কেটে নেওয়ার পর প্রতিমাসে তিনি পান মাত্র ৫৭০ টাকা। অথচ গত সাত বছরে ফজলুল হক লাখ লাখ টাকার মালিক বনে গেছেন বলে তার সহকর্মীরা বলছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ফজলুল হক যেসব জেলায় চাকরি করেছেন, সেখানকার সিভিল সার্জনকে ‘ম্যানেজ’ করে সরকারি ওষুধের চালান বিক্রি করেছেন। এভবে অর্জিত কোটি কোটি টাকার একাংশ তার ভাগ্যে জুটেছে। কিন্তু সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের সিভিল সার্জন ডা. উৎপলকুমার দেবনাথকে তিনি ‘ম্যানেজ’ করতে ব্যর্থ হন। ফলে সাড়ে ১১ কোটি টাকার ওষুধ আত্মসাতের অভিযোগে গত ৯ জুন তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। এবং গত ১৯ জুন তিনি চুয়াডাঙ্গায় দুদকের আগেকার একটি মামলার তদবির করতে গেলে দুদক তাকে গ্রেফতার করে।
সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তার জানিয়েছেন, ১৯৯১ সালে জেলার শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্বাস্থ্য সহকারী পদে চাকরিতে যোগ দেন এ কে ফজলুল হক। সেখানে কর্মরত অবস্থায় স্টোরকিপার অবসরে যান। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করে স্বাস্থ্য সহকারীর বেতনে ফজলুল হক স্টোরকিপার হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১৯৯২ সালে শ্যামনগর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্বরত অবস্থায় সেখানকার এক কুক মশালচি সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন তিনি। হাতেখড়ি হয় শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওষুধ চুরির।
মাত্র তিন বছরের চাকরিজীবনে বিতর্কিত হয়ে ওঠেন এই কর্মচারী। পরিস্থিতি সামাল দিতে নিজে তদবির করে ১৯৯৬ সালে কুষ্টিয়া জেলা স্বাস্থ্য বিভাগে স্টোরকিপার হিসেবে যোগদান করেন। কুষ্টিয়া জেলা স্বাস্থ্য বিভাগে কর্মরত অবস্থায় সেখানেও জড়িয়ে পড়েন ওষুধ চুরি থেকে শুরু করে নানা অনিয়মে। এক পর্যায়ে শাস্তিস্বরূপ ফজলুল হককে সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেকে বদলি করা হয় ১৯৯৯ সালে।
তৎকালীন স্বাস্থ্য বিভাগ ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ একীভূত হওয়ায় আশাশুনিতে দুই বিভাগের স্টোরকিপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। এখানেও তার রয়েছে নানা অপকীর্তি। আশাশুনি কর্মকালে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের আওতায় থাকা জন্মনিরোধক ট্যাবলেট ‘সুখি’ সরকারি অফিস থেকে পাচার করে ভারতে পাঠানোর সময় হাতেনাতে ধরা পড়েন। অভিযোগ রয়েছে, এই গুরুতর অপরাধেও কোনো শাস্তি পাননি ফজলুল হক। রাতারাতি তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করে ফেলেন। তবে ফজলুল হকের সে ঘটনা সংবাদপত্রে গুরুত্বসহকারে ছাপা হয়েছিল। এর ফলে ২০০২ সালের এঘটনায় শাস্তি হিসেবে তাকে চুয়াডাঙ্গা জেলা স্বাস্থ্য বিভাগে বদলি করা হয়।
শাস্তিমূলক বদলি হয়েও থেমে থাকেননি তিনি। অভিযোগ রয়েছে, চুয়াডাঙ্গার তৎকালীন সিভিল সার্জন নাজমুল হককে ‘ম্যানেজ’ করে কৌশলে চুয়াডাঙ্গাকে ‘দুর্যোগপ্রবণ এলাকা’ দেখিয়ে আট কোটি টাকার ওষুধ বরাদ্দ করিয়ে নেন। কিন্তু এই ওষুধ চুয়াডাঙ্গা পর্যন্ত আসেনি। চালান ধরেই বিক্রি করে দেন ঢাকার বাজারে। বিক্রিত টাকা কয়েকজনের মধ্যে ভাগবাটোয়ারার অভিযোগ ওঠে। তার মধ্যে সিভিল সার্জন নাজমুল হকের নামও ওঠে।
এঘটনা জানাজানির পর সংশ্লিষ্ট বিভাগ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন পৃথক তদন্তে নামে। সংশ্লিষ্ট বিভাগের বিভাগীয় তদন্তে ওষুধ চুরির বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় চুয়াডাঙ্গার সিভিল নাজমুল হকের চাকরি চলে যায়। তাকে কারাগারেও যেতে হয় এবং আত্মসাৎ করা টাকা সরকারি কোষাগারে বেতন থেকে প্রতিমাসে কর্তন করে ফেরতের শর্তে ফজলুল হক চাকরিতে বহাল রাখা হয়। তখন থেকে আজ পর্যন্ত তিনি প্রতিমাসে মাত্র ৫৭০ টাকা বেতন উত্তোলন করেন।
অপরদিকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ওষুধ চুরির অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পায়। তারা দুদক আইনে একটি মামলা করে। এরপর হাজারো অভিযোগের বোঝা মাথায় নিয়ে এ কে ফজলুল হক ২০০৭ সালে সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন অফিসের স্টোরকিপার হিসেবে ফের শাস্তিমূলক বদলি হন।
সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন অফিসের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ২০০৭ সালে সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন অফিসের দায়িত্বে ছিলেন ডা. আবু আজিজ আল মনসুর। তিনি মহাদুর্নীতিবাজ হিসেবে অভিযুক্ত ফজলুল হকের দুর্নীতির ঠিকুজি সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। ভয়ে তিনি ফজলুল হককে এই অফিসে কোনো দপ্তর দেননি। দুই বছরের বেশি সময় সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন অফিসে ঘুরে ফিরেই কেটেছে তার সময়। ২০০৯ সালে সিভিল সার্জন ডা. আবু আজিজ আল মনসুর অবসরে যান। নতুন সিভিল সার্জন হিসেবে সাতক্ষীরায় যোগদান করেন ডা. এবাদুল্লাহ। ডা. এবাদুল্লাহ যোগদানের মাত্র পাঁচদিনের মাথায় মহাদুর্নীতিবাজ এ কে ফজলুল হককে স্টোরকিপার হিসেবে দপ্তর দেওয়া হয়। অনেক দিন অলস বসে থাকার পর আবার মওকা পেলেন ফজলুল হক।
তখনকার স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন সাতক্ষীরার রুহুল হক। তাই এই জেলায় বিপুল বরাদ্দ আসতে থাকে। আবার এই মহাসুযোগ কাজে লাগাতে শুরু করেন ফজলুল হক। জনগণের জন্য বাদ্দ সরকারি ওষুধ প্রকাশ্যে বিক্রি করা শুরু করেন।
সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের  একাধিক সূত্রের দাবি, ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রতি মাসে ৫৭০ টাকা বেতন পেলেও স্বাস্থ্য বিভাগের এই নি¤œপদের কর্মচারী এখন অন্তত অর্ধশত কোটি টাকার মালিক।
সাতক্ষীরার শ্যামনগরের ভূরুলিয়া ইউনিয়নের খানপুর গ্রামের বাসিন্দা এ কে ফজলুল হক চাকরি পাওয়ার আগে জমাজমি সংক্রান্ত বিরোধে এক প্রতিবেশীকে অ্যাসিড মেরে ঝলসে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এঘটনায় মামলাও হয়। অ্যাসিডসন্ত্রাসের শিকার সেই ব্যক্তি আজও বেঁচে আছেন। কিন্ত ন্যায়বিচার পাননি ফজলুল হকের কালো টাকার প্রভাবে।

আরও পড়ুন