চিকিৎসা ব্যবস্থা বিপর্যস্ত শার্শা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে

আপডেট: 03:43:55 19/01/2019



img

স্টাফ রিপোর্টার : প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষের একমাত্র চিকিৎসা সেবা কেন্দ্র ৫০ শয্যার যশোরের শার্শা উপজেলা (নাভারন-বুরুজবাগান) স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। সরকারি এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এখন নামমাত্র কয়েকজন চিকিৎসক রয়েছেন যাদের বিরুদ্ধে রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা ও বাইরের পছন্দের বেসরকারি ক্লিনিকের সঙ্গে কমিশন বাণিজ্যের ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়াও সার্জারি যন্ত্রপাতি অপ্রতুল, অপরিচ্ছন্নতা, ওয়ার্ডে পানি ও বিদ্যুতের সমস্যা, ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত ওয়াশরুম, রোগীদের ওষুধ না দেওয়া, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসা রোগীদের কাছ থেকে ভিজিট নেওয়া, সরকারি ওষুধ চোরাই পথে বিক্রিসহ অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির কর্তাদের বিরুদ্ধে।
শার্শার ১১টি ইউনিয়নের প্রায় তিন লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র ভরসা ৫০ শয্যাবিশিষ্ট বুরুজবাগান স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি। ১৯৬২ সালে নির্মিত এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির নামকরণ করা হয় শার্শার আদর্শ গ্রাম বুরুজবাগানের নামে। প্রায় অর্ধশতাব্দী আগে নির্মিত সুপ্রাচীন এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি এখন শার্শা ও ঝিকরগাছা উপজেলার তিন লাখ মানুষের চিকিৎসার প্রধান কেন্দ্র। কিন্তুু সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সুযোগ-সুবিধা বাড়েনি। লোকবল, যন্ত্রপাতি চিকিৎসা সামগ্রীসহ সবকিছু রয়েছে পুরনো ধাঁচের। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিদিন প্রায় দুইশ রোগীর সমাগম ঘটে। গড়ে পাঁচ থেকে আট জন রোগী ভর্তি থাকেন। অন্যরা বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন।
অভিযোগ রয়েছে, ডাক্তারদের অবহেলার কারণে কোনো রোগীকে ভর্তির পর পরই ‘রোগীর অবস্থা ভালো নয়’- এমন কথা বলে যশোর জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন ক্লিনিকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। একদিকে বিপুল সংখ্যক রোগীর চাপ, অন্যদিকে ডাক্তার নার্স ও স্টাফদের সংকটের কারণে চিকিৎসা সেবা হচ্ছে বিঘ্নিত। তার ওপর রয়েছে ডাক্তার নার্সদের অবহেলা।
২০১৫ সালের ৩ মার্চ শার্শা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৫০ শয্যায় উন্নীত হলেও তিন বছরেও এখানে নতুন কোনো জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়নি। জনবলের অভাবে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়েছে। ১৬টি শূন্য পদ নিয়ে চলছে এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা ব্যবস্থা। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২২ জন ডাক্তারের পদ থাকলেও মাত্র ছয়জন ডাক্তার এখানে কর্মরত আছেন। হিসেব করলে দাঁড়ায়, প্রতি ৫০ হাজার মানুষের জন্য একজন মাত্র ডাক্তার। প্রতিদিন গড়ে দেড় থেকে দুইশ রোগী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগে চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। বহির্বিভাগে প্রত্যেক রোগীর কাছ থেকে টিকিটের জন্য পাঁচ টাকা করে আদায় করা হলেও রোগীরা কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর বেনাপোল। এখানে কয়েক হাজার শ্রমিক আমদানিকৃত পণ্য নামানো-উঠানোর কাজ করেন। প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে, আহত হন শ্রমিক। ডাক্তারের অভাবে মুমুর্ষু রোগী নিয়ে যেতে হয় বেনাপোল থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে যশোর জেনারেল হাসপাতালে। পথে অনেকে মারাও যান।
সরেজমিনে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, সকাল সাড়ে আটটা থেকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সাড়ে দশটার আগে কোনো চিকিৎসকের দেখা মেলে না স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। আবার বেলা একটা বাজতে না বাজতে কোনো ডাক্তারকে কর্মস্থলে খুঁজে পাওয়া যায় না।
অভিযোগ আছে, ডাক্তার, নার্স ও টেকনিশিয়ানদের চরম দুর্ব্যবহারেরও। সিজার করা রোগীর ড্রেসিং হয়নি দুই দিন ধরে, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বেডে শুয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করছেন, এমন দৃশ্যও দেখা গেছে। দূর-দূরান্ত থেকে রোগীরা চিকিৎসা নিতে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে ডাক্তার না পেয়ে চলে যান অনেকে।
উপজেলার আমতলা-গাতিপাড়া গ্রামের বৃদ্ধা রওশনারা (৬০) ও তাহেরা বেগম (৫৫) বললেন, ‘সকাল আটটায় টিকিট কেটে ডাক্তারের অপেক্ষায় বসে আছি। দশটা বাজতে চললো, এখনো কোনো ডাক্তার হাসপাতালে আসেনি।’
নাভারনের ফরিদুল ইসলাম বলেন, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা অশোককুমার সাহা নিজেই পছন্দের বেসরকারি ক্লিনিকে রোগী পাঠানোর পরামর্শ দিয়ে থাকেন। আবার কখনো হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসকের দায়িত্ব পালন করেন।
উপজেলার লক্ষ্মণপুর গ্রামের নয়নতারা (২৭) বলেন, ‘স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগ থেকে সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার নিজামুল ইসলাম কয়েকটি রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বাইরের পছন্দের বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠান। আমরা গরিব মানুষ। বেসরকারি হাসপাতালে ভালো ডাক্তারের কাছে চিকিৎসা নিতে গেলে অনেক টাকা লাগে। তাই নাভারনের এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসেছি। কিন্তু ডাক্তারের অভাবে ভালো চিকিৎসা পাচ্ছি না।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক কর্মচারী জানালেন, প্যাথলজিক্যাল বিভাগের টেকনিশিয়ান হুমায়ন কবির পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে থাকেন। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নিজস্ব প্যাথলজিক্যাল বিভাগে যে সব রোগের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যায়, তার ৮০ ভাগ রোগী শুধু কমিশন বাণিজ্যের জন্য বাইরের পছন্দের বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠান চিকিৎসকরা। ফলে গরিব রোগীরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, সরকারও রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
অভিযোগ অস্বীকার করে টেকনিশিয়ান হুমায়ুন কবীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নিজস্ব প্যাথলজিক্যাল ল্যাব থেকে করানো হয় বলে দাবি করেন।
এদিকে, অভিযোগ করা হয়, আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. এনাম উদ্দিন শিপন অফিসের বিভিন্ন কাজে অধিকাংশ সময়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হাসপাতালের বাইরে থাকেন। দাঁতের চিকিৎসক রাবেয়া খাতুনের চিকিৎসা সেবার মান সন্তোষজনক নয় বলে উপস্থিতি রোগীরা জানান। তিনি সারাক্ষণ মোবাইল ফোনে ফেসবুকে সময় কাটান। তার সহকারী আনিছুর রহমানকে রোগীদের সেবা না দিয়ে প্রায়ই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বারান্দায় বা অন্যরুমে গল্প করে সময় কাটাতে দেখা যায়। নাভারন বাজারে আনিছুর রহমানের নিজস্ব দন্ত্য চিকিৎসালয় থাকায় তিনি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের রোগীদের সেখানে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন বলে রোগীদের অভিযোগ।
হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক উৎপলা দত্ত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে না বসে অধিকাংশ সময়ে বাসায় অবস্থান করেন। হোমিও চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর উপস্থিতি দেখে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা অশোককুমার সাহা মোবাইল ফোনে চিকিৎসক উৎপলা দত্তকে ডেকে আনেন। ডাক্তাররা না থাকলে মাঝে মধ্যে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক উৎপলা দত্ত অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসকের দায়িত্ব পালন করে থাকেন। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রশাসনিক ব্যবস্থা এতোই নাজুক যে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত স্টোরকিপার প্রায় সময় জরুরি বিভাগে চিকিৎসকের দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সার্জিক্যাল বিভাগ, মেডিসিন বিভাগ, গাইনি বিভাগ ও এ্যানেস্থেসিয়া বিভাগে কনসালটেন্ট পদে কখনো কোনো ডাক্তার নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বিপর্যস্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা অশোককুমার সাহা অবশ্য ভিন্ন কথা বলছেন। তার বক্তব্য, ‘ডাক্তারের ২২টি পদ থাকলেও আছেন মাত্র ছয়জন। আমি সবাইকে বলে দিয়েছি আজ থেকে কোনো রোগীকে আর প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার জন্য বাইরে না পাঠাতে। সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডাক্তারের সংকট রয়েছে, কোথাও দুই তিনজনের বেশি ডাক্তার নেই। সরকারিভাবে নতুন করে নিয়োগ দিলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।’

আরও পড়ুন