ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতিতে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ভূমিকা কী

আপডেট: 05:22:36 05/05/2019



img

সুবর্ণভূমি ডেস্ক : আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ বলেছেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের দেওয়া আগাম তথ্যের কারণে সরকার ও দলীয়ভাবে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলার সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করা সম্ভব হয়েছে। যার ফলে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
শনিবার ধানমন্ডিতে দলীয় সভাপতির কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এ কথা বলেন মাহবুবুল আলম হানিফ।
বাংলাদেশের প্রথম যোগাযোগ উপগ্রহ 'বঙ্গবন্ধু-১' স্যাটেলাইটটি সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয় গত ১২ মে।
সেটি মূলত কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট বা যোগাযোগ উপগ্রহ।
মি. হানিফ বলেন, "গত কয়েকদিন ধরে সারাদেশের মানুষ উদ্বেগ উৎকণ্ঠার মধ্যে ছিল। ইতোমধ্যেই ২০০ কিলোমিটার বেগে ভারতের উড়িষ্যা প্রদেশে আঘাত হানে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আজ(শনিবার) ভোর থেকেই বাংলাদেশের কিছু কিছু এলাকায় ফণী আঘাত হানে। তবে দুর্বল হয়ে ধীরে ধীরে বাংলাদেশের সীমানা অতিক্রম করার পথে।..."
এরপর একটা পর্যায়ে তিনি সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং পরে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, "আমরা মহাশূন্যে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মাধ্যমে এই যে আমাদের ঘূর্ণিঝড়ের, গভীর সমুদ্রে যে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হচ্ছে প্রায় ২০০০ কিলোমিটার দূরে, সেইটার শুরু থেকেই আমরা কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে আমাদের দেশের আবহাওয়া অধিদপ্তর খবর সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিল।"
তিনি আরো বলেন, "আজকে এই স্যাটেলাইটের কারণেই কিন্তু আমরা আগাম সতর্কতার তথ্য পেয়েছিলাম বিধায় আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে দলীয়ভাবে আমরা এই ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলাম"।
মহাশূন্যে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের ফলে সর্বাত্মক প্রস্তুতি গ্রহণ এবং সবরকম ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সক্ষম হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মাহবুবুল আল হানিফের এই বক্তব্য নিয়ে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট 'পর্যবেক্ষণ স্যাটেলাইট' না হওয়ায় আবহাওয়ার পূর্বাভাসে এর আদৌ কোনো ভূমিকা ছিল কিনা এনিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ।

আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রদানে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ভূমিকা কতটা
আবহাওয়া বিভাগের পরিচালক শামসুদ্দিন আহমেদের কাছে এই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, "বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট একটি যোগাযোগ স্যাটেলাইট। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট কখন ব্যবহৃত হয় যখন আমরা যে পূর্বাভাস প্রস্তুত হয়ে গেল, যখন ঘূর্ণিঝড় আসে তখন বিদ্যুৎ চলে যায়, তখন স্বাভাবিক যোগাযোগ থাকে না।"
"সেইসময় আমাদের প্রস্তুতকৃত পূর্বাভাসটি রিমোট আইল্যান্ড বা প্রত্যন্ত জায়গায় পৌঁছানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। হয়তো সেসময় বিদ্যুৎ থাকবে না, স্বাভাবিক রেডিও যোগাযোগ থাকবে না তখন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তথ্য পৌঁছানোর কাজ করা হবে।"
তিনি বলেন, এটা তাদের পরিকল্পনায় রয়েছে।
বৈশ্বিক উষ্ণতা কঠিন করে দিচ্ছে আবহাওয়াবিদদের কাজ
"বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট দিয়ে মেঘ পর্যবেক্ষণের যোগাযোগ হয় না, এটা দিয়ে ব্রডকাস্টিং হয়। একসময় এটি কাজে লাগবে কারণ যখন যোগাযোগ ভেঙে পড়বে তখন এটি ছাড়া কোনো কাজ করা যাবে না।
যে পদ্ধতিতে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের আগাম সতর্কতা তৈরি করা হয়েছে, সে প্রসঙ্গে মি. আহমেদ বলেন, "সারা বাংলাদেশে আমাদের পর্যবেক্ষণ নেটওয়ার্ক-এর মাধ্যমে তথ্য নিয়েছি আমরা।"
তিনি বলেন, সারাদেশে ৪৭টি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগার আছে। প্রতি তিন ঘণ্টা অন্তর অন্তর বাতাসের বেগ, তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়, মেঘের গতি ও তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয় রাতদিন।
সেগুলোর তথ্য তাদের হাতে ছিল। সেসব তথ্য বিশ্লেষণ করা হয় এবং তার থেকে পূর্বাভাস প্রস্তুত করা হয়।
"গতবছর এর জন্য উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার সংযোজন করা হয়, যাকে অপারেশনাল নিওমেরিকেল ওয়েদার প্রেডিকশন বলা হয়। সেই প্রেডিকশনে আবার স্যাটেলাইটে যে পর্যবেক্ষণগুলো হয় সেগুলো থাকে।"
"স্যাটেলাইট বলতে ইউরোপীয়ান মেটিরোলজিক্যাল যে স্যাটেলাইট সিস্টেম আছে তাদের পর্যবেক্ষণগুলো এর মাধ্যমে প্রসেস করেছি।"
যেসব পদ্ধতিতে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে এবং পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে-তা ছিল ত্রি-মাত্রিক সমন্বয়।
• স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ(ইউরোপিয়ান মেটিওরোলজিক্যাল স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ)
• রাডারের পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ
• আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ
এরপর প্রতি ছয় ঘণ্টা পরপর আপডেট করা হয়েছে এবং পূর্বাভাস প্রচার করা হয়েছে।

'জাপান ও ইউরোপীয় স্যাটেলাইট থেকে তথ্য নেওয়া হয়েছে'
আবহাওয়া বিভাগের পরিচালক শামসুদ্দিন আহমেদ বলেন, "ভারতীয় আবহাওয়া অধিদপ্তর সক্ষমতার চেয়েও অনেক ক্ষেত্রে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের বেশি।"
এমনকি শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, মায়ানমারের চেয়ে সক্ষমতা বেশি বলেও তিনি জানান।
এখন পর্যন্ত যেসব স্যাটেলাইট থেকে তথ্য নেওয়া হয় সে প্রসঙ্গে মি. আহমেদ বলেন, জাপান আবহাওয়া অধিদপ্তরে সঙ্গে সুসম্পর্কের ভিত্তিতে সেখানকার স্যাটেলাইটের ম্যাধমে ঘূর্ণিঝড়ের তথ্য পেয়ে থাকে বাংলাদেশের আবহাওয়া বিভাগ।
এছাড়া ইউরোপীয় আবহাওয়া বিভাগ থেকে তথ্য নেওয়া হয়।
ঘূর্ণিঝড় ফণীর পূর্বাভাস বিষয়ে ভারতের সঙ্গে তথ্যগত দিকে কিছু পার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে।
এই প্রসঙ্গে মি. আহমেদ বলেন, ঘূর্ণিঝড়টির তীব্রতার দিক থেকে আমাদের এবং ভারতের তথ্যের কোনো ভিন্নতা ছিল না। তবে তারা প্রথমে বলেছিল, এটি তামিলনাড়ুর দিক দিয়ে চেন্নাই উপকূল অতিক্রম করবে। সেটা তারা পরে আবার পরিবর্তন করে বলেছে যে, এটা এক্সট্রিমলি সিভিয়ার সাইক্লোন এবং চেন্নাই অতিক্রম করবে অন্ধ্র উপকূল দিয়ে।
তিনি যোগ করেন, "এরও পরে তারা বলল, এটি উড়িষ্যা উপকূল অতিক্রম করবে। তিনবার তারা তথ্য পরিবর্তন করে। এর মানে হচ্ছে, আবহাওয়াগত বিষয় নিয়মিত পরিবর্তিত হওয়া স্বাভাবিক, এটা কারো ভুল নয়। সুতরাং তীব্রতার দিক দিয়ে তাদের সাথে আমাদের মিল ছিল।"
"বাংলাদেশে পূর্বাভাসে আমরা বলেছি, সেটি যখন বাংলাদেশে ঢুকবে বিপদ সংকেত ৭ হবে। এটা বাংলাদেশে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৮১ কিলোমিটার বেগে রেকর্ড করা হয় কুমিল্লার কাছে, বরিশালে ছিল ৭৪ কিলোমিটার। মোট বাতাসের গতিবেগ ছিল ৬২ থেকে ৮১ কিলোমিটার পর্যন্ত।"
[বিবিসির বিশ্লেষণ]

আরও পড়ুন