ঘুষের বিনিময়ে বৃত্তি

আপডেট: 03:01:18 19/04/2017



img

আব্দুস সামাদ, সাতক্ষীরা : সাতক্ষীরায় টাকার বিনিময়ে প্রাথমিকে প্রাপ্ত নাম্বার পাল্টে কম মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি পাইয়ে দেওয়া হয়েছে।
তদন্তে এই অপকর্মের সত্যতা পাওয়ায় ইতিমধ্যে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার তৎকালীন কালিগঞ্জ উপজেলার ভারপ্রাপ্ত উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ফারুক হোসেন ও ডাটা এন্ট্রি অপারেটর ভবতোষ সরকারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অধিদপ্তরে সুপারিশ করেছেন।
এদিকে, দুর্নীতির দায় থেকে মুক্তি পেতে কালিগঞ্জ উপজেলার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ফারুক হোসেন ও ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন স্থানে দরবার শুরু করেছেন। কালিগঞ্জ উপজেলার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ফারুক হোসেন তিন দিনের ছুটি নিয়ে ঢাকায় গিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন কালিগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুল হাকিম।
তবে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলেও এখনো কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি জানিয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসার বলেন, ‘এখনো ফারুক হোসেন সহকারী শিক্ষা অফিসার হিসেবে এবং ভবতোষ সরকার ডাটা এন্ট্রি অপারেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, তৎকালীন কালিগঞ্জ উপজেলার ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ফারুক হোসেন ও ডাটা এন্ট্রি অপারেটর ভবতোষ সরকার টাকার বিনিময়ে কম মেধাবী শিক্ষার্থীদের বেশি নাম্বার দিয়ে রেজাল্ট শিট তৈরি করে বৃত্তির জন্য জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের মাধ্যমে অধিদপ্তরে পাঠান। বিষয়টি বুঝতে পেরে মেধাবী শিক্ষার্থীদের পক্ষে মঞ্জুরুল হক নামে এক অভিভাবক সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক ও কালিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে প্রতিকার চেয়ে অভিযোগ করেন। মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন বিষয়টি আমলে নিয়ে জরুরি তদন্তের নির্দেশ দেয়। নির্দেশ মোতাবেক জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. অহিদুল আলম বর্তমান কালিগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুল হাকিমকে দিয়ে তদন্ত করান। তিনি নিজেও ঘটনাস্থলে গিয়ে খোঁজ নেন।
অপরদিকে, কালিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসারও অভিযোগের তদন্ত করার জন্য পৃথক কমিটি গঠন করেন। কালিগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নির্দেশে বিষয়টি তদন্ত করেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)। এ তদন্ত কমিটি তিনটি রোল নিয়ে তদন্ত করে একটি রোলে নাম্বার পাল্টে বৃত্তি পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পেয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার। অন্য তদন্ত কমিটি প্রায় দশ জন শিক্ষার্থীর নাম্বার বদলে দেওয়ার সত্যতা পেয়েছে বলে তিনি জানান।
অভিযোগ থেকে জানা যায়, কালিগঞ্জ উপজেলার ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা অফিসার ফারুক হোসেন ও ডাটা এন্ট্রি অপারেটর ভবতোষ সরকার কম নাম্বারপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের দশ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার বিনিময়ে বেশি নম্বার দিয়ে নাম্বার শিট তৈরি করে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে পাঠান। জেলা শিক্ষা অফিস থেকে সে নম্বার শিট শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়। এতে যারা বিদ্যালয়গুলোতে কম মেধাবী শিক্ষার্থী বলে পরিচিত ছিল, তাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বেশি নাম্বার পাইয়ে দেওয়া হয় এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের নাম্বার কমিয়ে দেওয়ায় তারা বৃত্তি থেকে বঞ্চিত হয়। বৃত্তিপ্রাপ্তদের তালিকায় অনেক কম মেধাবী শিক্ষার্থী বৃত্তি পেয়েছে বলে দেখা যায়। তাছাড়া তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ফরুক হোসেন ও ডাটা এন্ট্রি অপারেটরের নিকটাত্মীয়সহ একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে টাকার বিনিময়ে নাম্বার পাল্টে দিয়ে বৃত্তি পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগের সত্যতাও মেলে।
সাতক্ষীরা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. অহিদুল আলমের গঠিত তদন্ত কমিটি তৎকালীন কালিগঞ্জ উপজেলার ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ফারুক হোসেন ও ডাটা এন্ট্রি অপারেটর ভবতোষ সরকারের বিরুদ্ধে নয়জন শিক্ষার্থীর নাম্বার বদলে দেওয়ার সত্যতা পায়। একই সঙ্গে কমিটি শিক্ষার্থীদের ফলাফল বদলে বেশি নম্বার দিয়ে বৃত্তি পেতে সহযোগিতা করা এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের নাম্বার কমিয়ে দিয়ে বৃত্তি থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পায়। তদন্ত কমিটি এসব বিষয়ে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের কাছে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।
এদিকে, সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার শামসুন্নাহারসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলা শিক্ষা অফিসার ও ডাটা এন্ট্রি অপারেটরের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ রয়েছে। উপজেলা শিক্ষা অফিসাররা ডাটা এন্ট্রি অপরেটরদের যোগসাজসে নাম্বার বদলে এ ধরনের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে সাতক্ষীরা জেলায় এ চক্রটি সক্রিয় রয়েছে। তবে এ বছরই প্রথম এ অভিযোগের সত্যতা মিললো।
এদিকে, নাম্বার জালিয়াতির অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তৎকালীন কালিগঞ্জ উপজেলার ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ফারুক হোসেন।
তিনি বলেন, ‘কয়েকটা নাম্বার ভুল হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত হয়েছে। বর্তমানে আমি সাতক্ষীরার বাইরে আছি। এর বেশি কিছু না।’
অপর অভিযুক্ত ডাটা এন্ট্রি অপারেটর ভবতোষ সরকার বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। আমি শুধু ডাটা এন্ট্রি করেছি।’
কালিগঞ্জের বর্তমান উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার আব্দুল হাকিম বলেন, ‘জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসারের নির্দেশে আমি বিষয়টি তদন্ত করেছি। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছি। আমি তদন্ত প্রতিবেদন জেলা অফিসে পাঠিয়ে দিয়েছি।’
অপর দিকে উপজেলা নির্বাহী অফিসার গেলাম মাঈনউদ্দিন হাসান বলেন, ‘বিষয়টি তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেছে। আমি সুপারিশ করে জেলা প্রশাসক মহোদয়ের কাছে প্রতিবেদন পেশ করেছি।’
সাতক্ষীরা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. অহিদুল আলম বলেন, ‘দুর্নীতির মাধ্যমে কালিগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা অফিসার ফারুক হোসেন ও ডাটা এন্ট্রি অপারেটর ভবতোষ সরকার ফলাফল বদলে দিয়েছিলেন। বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখে তদন্ত করা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। ইতিমধ্যে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে অধিদপ্তরে সুপারিশ করা হয়েছে। এখন অধিদপ্তর তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’
তিনি আরো জানান, যদি কালিগঞ্জ উপজেলাসহ জেলার অন্য কোনো উপজেলার শিক্ষার্থীরা মনে করে তাদের নাম্বার বদলে দেওয়া হয়েছে, তাহলে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে অথবা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে অভিযোগ করতে পারবে। অভিযোগ পাওয়া গেলে যাচাই বাছাই করে দেখা যেতে পারে। ইতিমধ্যে বেশ কয়টি অভিযোগ এসেছে বলেও তিনি জানান।
উল্লেখ্য, গত ১১ এপ্রিল ঘোষিত বৃত্তির ফলাফলে জেলার সাতটি উপজেলা থেকে এক হাজার একজন শিক্ষার্থী প্রাথমিক বৃত্তি লাভ করেছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় সর্বাধিক সাধারণ গ্রেডে ১৪৫ জন এবং ট্যালেন্টপুলে ৮৬ জন, কালিগঞ্জ উপজেলায় সাধারণ গ্রেডে ৭৫ জন এবং ট্যালেন্টপুলে ৫৩ জন, আশাশুনি উপজেলায় সাধারণ গ্রেডে ৬৯ জন এবং ট্যালেন্টপুলে ৫৬ জন, কলারোয়া উপজেলায় সাধারণ গ্রেডে ১২৩ জন, ট্যালেন্টপুলে ৫২ এবং সম্পূরক বৃত্তি লাভ করেছে ছয়জন। তালা উপজেলায় সাধারণ গ্রেডে ৭৫ জন এবং ট্যালেন্টপুলে ৬২ জন, দেবহাটা উপজেলায় সাধারণ গ্রেডে ৩৩ জন এবং ট্যালেন্টপুলে ২৩ জন ও শ্যামনগর উপজেলায় সাধারণ গ্রেডে ৭৫ জন এবং ট্যালেন্টপুলে ৬৮ জন বৃত্তি লাভ করেছে।

আরও পড়ুন