খুলনা-যশোর শিল্পাঞ্চলে অচলাবস্থা

আপডেট: 05:35:30 07/01/2018



img
img
img

জিয়াউস সাদাত, খুলনা : গত ২৮ ডিসেম্বর শুরু হওয়া কর্মবিরতি এখনো চলছে। ফলে পুরো অচল হয়ে পড়েছে খুলনা-যশোর শিল্পাঞ্চল। শ্রমিকদের কর্মবিরতিতে বন্ধ হয়ে গেছে মিলগুলোর উৎপাদন। আট মিলে প্রতিদিন লোকসান হচ্ছে প্রায় দুই কোটি টাকা।
বকেয়া মজুরি বেতন পরিশোধসহ ১১ দফা দাবিতে খুলনা-যশোর অঞ্চলের আট রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের শ্রমিকরা উৎপাদন বন্ধ রেখে লাগাতার আন্দোলন কর্মসূচি পালন করছেন গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে। বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশে শিল্পাঞ্চলগুলো উত্তাল হয়ে উঠছে। আন্দোলন চলাকালেই ১ জানুয়ারি প্লাটিনাম জুটমিলের সূতা বিভাগের সরদার আবুল খায়ের খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মা যান। এ কারণে শ্রমিকরা ৩ তারিখে শোক পালন করেন। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও প্রথম কয়েক দিন মিছিল, সভা-সমাবেশ করেননি শ্রমিকরা। মজুরি না পেয়ে অর্ধাহারি ক্ষুব্ধ ৫০ হাজার শ্রমিক আন্দোলনে শামিল হয়েছেন। রাষ্ট্রায়ত্ত জুটমিল সিবিএ-নন সিবিএ পরিষদের আহ্বানে এ কর্মসূচি পালিত হচ্ছে।
৪ জানুয়ারি খালিশপুর শিল্পাঞ্চলে সড়ক অবরোধ, টায়ারে অগ্নিসংযোগ করে বিক্ষোভ করে শ্রমিকরা। ওই দিন ক্রিসেন্ট, স্টার, ইস্টার্ন, খালিশপুর ও দৌলতপুর জুটমিলে শ্রমিকদের এক সপ্তাহের মজুরি প্রদান করা হলেও প্লাটিনাম, আলীম ও জেজেআই-তে কোনো অর্থ প্রদান করা হয়নি। ফলে প্লাটিনাম জুটমিল শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেন। ওই দিন খোলা হয় লঙ্গরখানা। দুপুরে সেখানেই শ্রমিকরা খান। সেই থেকে এখনও চলমান রয়েছে লঙ্গরখানা।
শ্রমিকরা জানান, মজুরি না পেয়ে অভুক্ত অবস্থায় উৎপাদন অব্যাহত রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। নিরুপায় হয়েই তারা উৎপাদন বন্ধ করে আন্দোলনে নেমেছেন। বকেয়া সব মজুরি এক সঙ্গে না পাওয়া পর্যন্ত তারা কাজে ফিরে যাবেন না। ক্রিসেন্ট জুটমিলের স্পিনিং বিভাগের শ্রমিক আবু কালাম বলেন, ‘নয় সপ্তাহের মজুরি বকেয়া রয়েছে। খাবারই জোটে না, কাজে গতি আসবে কীভাবে? ছেলেমেয়েদের স্কুল কলেজে ভর্তি করানো যাচ্ছে না।’
প্লাটিনাম জুটমিলের তাঁত বিভাগের শ্রমিক হাসান বলেন, ‘দোকানদার আর বাকিতে চাল-ডাল দিচ্ছে না। না খেয়ে থাকা ছাড়া কোনো উপায় নেই। উপায়হীন হয়ে কর্মবিরতি পালন করছি।’
প্লাটিনাম জুটমিল সিবিএ’র সাবেক সভাপতি খলিলুর রহমান বলেন, ‘মজুরি না পেয়ে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটানো শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। অথচ মিল কর্তৃপক্ষ বকেয়া টাকা প্রদানের ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।’
বাংলাদেশ রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল সিবিএ-নন সিবিএ পরিষদের কার্যকরী আহ্বায়ক সোহরাব হোসেন বলেন, ‘শ্রমিকদের বকেয়া সব মজুরি এক সাথে পরিশোধ না করা পর্যন্ত কেউ কাজে ফিরে যাবে না।’
আলীম জুটমিলের সিবিএ সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম লিটু বলেন, ‘মিলের শ্রমিকরা না খেয়ে রয়েছে। তাদের পরিবারে অসন্তোষ বিরাজ করছে। এ অবস্থায় শ্রমিকরা বাধ্য হয়েই আন্দোলনে নেমেছে।’
শ্রমিকনেতারা জানান, পে-কমিশনের মতো একই তারিখ থেকে মজুরি কমিশন ঘোষণা ও বাস্তবায়ন, অবিলম্বে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পে শ্রমিকদের জন্য মজুরি কমিশন বোর্ড গঠন, ২০ শতাংশ মহার্ঘ্য ভাতার অপরিশোধিত বকেয়া এককালীন পরিশোধ, বকেয়া মজুরি-বেতন পরিশোধ, প্রতি সপ্তাহে ও মাসে শ্রমিক-কর্মচারীদের মজুরি-বেতন নিয়মিত প্রদান, বদলি শ্রমিকদের স্থায়ীকরণসহ ১১ দফা না মানা পর্যন্ত তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
শ্রমিক আন্দোলনের কারণে খুলনার খালিশপুরের ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম, খালিশপুর, দৌলতপুর, দিঘলিয়ার স্টার, আটরা শিল্প এলাকার আলীম, ইস্টার্ন এবং যশোরের নওয়াপাড়া শিল্প এলাকার জেজেআইয়ের উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।

সর্বশেষ অবস্থা
আন্দোলন শুরুর পর থেকে খালিশপুরে খুলনা-যশোর অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত সব পাটকলের শ্রমিকনেতারা দফায় দফায় বৈঠক করেন। বৈঠক হয় বিজেএমসির আঞ্চলিক কার্যালয়ে লিয়াজোঁ কর্মকর্তার সঙ্গেও। তিনি কর্মবিরতি প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান। তবে শ্রমিকরা মজুরি না পেয়ে কাজে যোগদান করবেন না বলে ঘোষণা দেন। আজ রোববার ঢাকায় সিবিএ-ননসিবিএ পরিষদের অস্থায়ী কার্যালয়ে বিজেএমসির নিয়ন্ত্রণাধীন সারাদেশের পাটকলের সিবিএ-ননসিবিএ নেতাদের বৈঠক রয়েছে। বৈঠকে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে বলে সিবিএ নেতারা জানিয়েছেন। গতকাল শনিবার সকাল দশটা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত প্রত্যেক মিলগেটে সভা শেষে দুপুরে পাটকল শ্রমিকনেতারা ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল সিবিএ-নন সিবিএ পরিষদের যুগ্ম-আহ্বায়ক সোহরাব হোসেন বলেন, ‘খুলনা-যশোর অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত নয় পাটকলে শ্রমিকদের নিয়মিত মজুরি পরিশোধ করা হচ্ছে না। এ ছাড়া ২০১৫ সাল থেকে পে কমিশন প্রদান করা হচ্ছে। অথচ শ্রমিক কর্মচারীদের মজুরি কমিশন গত আড়াই বছরে বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে শ্রমিকদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। কর্তৃপক্ষ বার বার প্রতিশ্রুতি দিয়েও মজুরি কমিশন গঠন করেনি। বরং শ্রমিকদের সপ্তাহিক মজুরি বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে শ্রমিকরা ফুঁসে উঠে কাজ বন্ধ রেখেছে। শ্রমিকদের দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা কাজে যোগদান করবে না।’
তিনি জানান, আজ ঢাকায় সারাদেশের সিবিএ-ননসিবিএ নেতাদের বৈঠক রয়েছে। বৈঠকে নতুন করে কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।
শ্রমিকনেতারা জানান, পাটকলগুলোর মধ্যে ক্রিসেন্ট জুটমিলে প্রায় পাঁচ হাজার, প্লাটিনামে সাড়ে চার হাজার, স্টারে সাড়ে চার হাজার, দৌলতপুর জুটমিলে সাড়ে ছয়শ, ইস্টার্নে দুই হাজার, আলীমে দেড় হাজার, জেজেআইতে দুই হাজার ৬০০ এবং খালিশপুর জুটমিলে প্রায় সাড়ে চার হাজার শ্রমিক রয়েছেন। এসব পাটকলের শ্রমিকদের চার থেকে ১২ সপ্তাহের মজুরি বকেয়া রয়েছে।

কর্তৃপক্ষের ভাষ্য
ক্রিসেন্ট জুটমিলের প্রকল্পপ্রধান আবুল কালাম হাজারী বলেন, ‘মিলের হিসাবে কিছু টাকা এসেছে। যা দিয়ে একটা মজুরি ও কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের এক মাসের বকেয়া পরিশোধ করা সম্ভব। শ্রমিকরা কাজে যোগ দিলে কর্মকর্তাদের বেতন না দিয়ে শ্রমিকদের দুটি মজুরি দেওয়া সম্ভব।’
এ প্রস্তাবে সিবিএ নেতারা রাজি হননি বলে জানান প্রকল্পপ্রধান। এ অবস্থায় একটি মজুরি ও কর্মচারী-কর্মকর্তাদের এক মাসের বেতন প্রদান করা হয়।
প্লাটিনাম জুটমিলের প্রকল্পপ্রধান মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, টাকা ব্যাংকে জমা না হলে মজুরি প্রদানের বিষয়ে কিছুই বলা যাবে না।
বিজেএমসি খুলনা অঞ্চলের লিয়াজোঁ কর্মকর্তা গাজী শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘শ্রমিকরা মিলের উৎপাদন বন্ধ করে অহেতুক পরিবেশ উত্তপ্ত করছে। বকেয়া পরিশোধের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।’
বিজেএমসির খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম, খালিশপুর, দৌলতপুর, স্টার, ইস্টার্ন, আলিম ও যশোরের জেজেআই জুটমিল চালু থাকলে প্রতিদিন প্রায় ২২৫ মেট্রিক টন পাটজাত পণ্য উৎপাদন হতো। সেই হিসেবে সপ্তাহে এক হাজার ৩৫০ মেট্রিক টন পাটজাত পণ্য উৎপাদন বিঘিœত হচ্ছে। যার মূল্য প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকা।
সূত্রটি জানায়, আটটি পাটকলের ২৬ হাজার ৭১৮ জন শ্রমিকের চার থেকে ১২ সপ্তাহের মজুরি বকেয়া রয়েছে। সবমিলিয়ে শ্রমিকদের পাওনার পরিমাণ ৪০ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। নয়টি পাটকলে বর্তমানে ২১ হাজার ৪৭৪ মেট্রিক টন পাটজাত পণ্য বিক্রির অপেক্ষায় পড়ে রয়েছে। যার দাম প্রায় ২১৫ কোটি টাকা।
বিজেএমসির খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয়ের লিয়াজোঁ কর্মকর্তা গাজী শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘শ্রমিকদের পাওনার পরিমাণ ৪০ কোটি টাকা। উৎপাদিত কিছু পণ্য বিক্রি করা হয়েছে। বিক্রয়লব্ধ অর্থ পাওয়া গেলে পাওনা পরিশোধ করা সম্ভব হবে।’

আরও পড়ুন