কর্তারা কথা রাখেননি, মাতৃগর্ভে গুলিবিদ্ধের পরিবারে ঈদ ফিকে

আপডেট: 12:40:07 06/07/2016



img
img

শিমুল হাসান, মাগুরা : মাতৃগর্ভে গুলিবিদ্ধ হয়ে দেশব্যাপি আলোচিত শিশু সুরাইয়ার পবিবারে নেই ঈদ আনন্দ। আগামী ২৩ জুলাই এক বছর বয়স পূর্ণ হতে যাচ্ছে শিশুটির।
ঢাকায় চিকিৎসাকালে মন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা হাসপাতালে ছুটে এসেছিলেন। তারা সুরাইয়াকে সরকারিভাবে চিকিৎসা, তার ভরণপোষণ, লেখাপড়ার দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন তারা কেউ আর খোঁজ রাখেন না।
সুরাইয়া শারীরিকভাবে দৃশ্যত সুস্থ থাকলেও তার গুলিবিদ্ধ ডান চোখটি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে। বাম চোখটির দৃষ্টিশক্তি অক্ষুণœ রাখতে প্রতি তিন মাস অন্তর ঢাকায় চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও অর্থাভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না। তার চা-দোকানি গরিব বাবার পক্ষে মেয়ের চোখের চিকিৎসা ও পরিবারের পাঁচ সদস্যের ভরণ-পোষণ যেখানে কষ্টকর, সেখানে ঈদের বাড়তি আয়োজন পরিবারটির কাছে অসম্ভব।
মাগুরা শহরতলীর দোয়ারপাড় এলাকায় সুরাইয়ার বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, বর্তমানে সে আর দশটি সুস্থ শিশুর মতো কখনো হাসছে-কাঁদছে আবার কখনো হাত-পা নেড়ে খেলছে। ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগে মাতৃগর্ভে থাকা অবস্থায় যে নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছিল, মানুষরূপী পাষ-দের ছোড়া তপ্ত বুলেট তার তুলতুলে নরম শরীরকে রক্তাক্ত করেছিল, তা বোঝার বয়স হয়নি সুরাইয়ার। মা-বাবাসহ পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন প্রতিবেশীদের আদর-যতœ, ¯েœহ-ভালোবাসায় তরতরিয়ে বাড়ছে সে।
সুরাইয়ার মা নাজমা বেগম বলেন, ‘সাড়ে সাত মাসের গর্ভকালে পেটে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর মাগুরা সদর হাসপাতালের চিকিৎসকরা ঝুঁকি নিয়ে অপারেশ করে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে আমাদের দুটি জীবন বাঁচান। অপারেশনের পর শরীরের একাধিক স্থানে গুলিবিদ্ধ নবজাতক সুরাইয়া ও তার জীবন যখন যায় যায় অবস্থা তখন মাগুরার পুলিশ সুপার নিজে অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে নগদ টাকা দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য আমাদের ঢাকায় পাঠান। জেলা প্রশাসক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। তা না হলে দরিদ্র চা-দোকানি স্বামীর পক্ষে আমাদের বাঁচানো সম্ভব ছিল না।’
‘পরে ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসকরা যে আন্তরিকতা দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে চিকিৎসা করে সুস্থ করে তুলেছেন, সাংবাদিকরা লিখেছেন, দেশের মানুষ যে দোয়া ভালোবাসা দেখিয়েছে, সে ঋণ কখনো শোধ হবার নয়,’ বলছিলেন নাজমা।
‘ঢাকায় হাসপাতালে থাকা অবস্থায় মন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের বড়-বড় মানুষেরা ছুটে এসে সুরাইয়াকে সরকারিভাবে চিকিৎসা, তার ভরণপোষণ, লেখাপড়ার দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন তারা কেউ আর খোঁজ রাখেন না’, আক্ষেপ করেন এই গৃহবধূ।
পরিবারটির সদস্যরা জানান, গুলিতে সুরাইয়ার ডান চোখটি নষ্ট হয়ে গেছে। চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলেছেন, ডান চোখটিতে সে আর কখনো দেখতে পাবে না। তবে বাম চোখটির দৃষ্টিশক্তি অক্ষুণœ রাখার জন্য নিয়মিত চিকিৎসা করাতে হবে। বাম চোখের চিকিৎসার জন্য তিন মাস পর পর ঢাকায় নেওয়ার কথা থাকলেও অর্থাভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না। চা-দোকানি স্বামীর সামান্য আয়ে নিদারুণ অর্থকষ্টে পরিবারের সদস্যদের খেয়ে না খেয়ে দিন কাঠছে।
নাজমা বেগম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, ‘সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নানা প্রতিশ্রুতিতে তিনি সুরইয়াকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেছিলেন। ভেবেছিলেন, সুরাইয়া বড় হয়ে অধিকাংশ বাঙালি নারীর মতো সংসার, স্বামী-সন্তান নিয়ে সুস্থভাবে জীবনযাপন করবে। কিন্তু সে স্বপ্ন ফিকে হয়ে যাচ্ছে।’
নাজমা বেগম সরকারের কাছে দাবি জানান, তার পরিবারের ভার নিক বা না নিক, অন্তত পূর্ব-ঘোষণা অনুযায়ী সরকার সুরাইয়ার লেখাপড়াসহ তাকে ভালোভাবে বেড়ে ওঠার দায়িত্ব নিক। যাতে সে লেখাপড়া শিখে মানুষের মতো মানুষ হতে পারে।
সুরাইয়ার বাবা বাচ্চু ভূঁইয়া জানান, সর্বশেষ জুলাই মাসে তিনি সুরাইয়াকে ঢাকায় নিয়ে চোখের চিকিৎসা করিয়েছেন। ঢাকার ডাক্তারা বিনে পয়সায় তার চিকিৎসা করেছেন। কিন্তু পাঁচ সদস্যের সংসারের ঘানি টানতে গিয়ে যেখানে হিমশিম খাচ্ছেন, সেখানে স্ত্রীসহ সুরাইয়াকে নিয়মিত ঢাকায় নিয়ে চিকিৎসা করানোর সামর্থ তার নেই।
ঈদের আয়োজনের কথা জানতে চাইলে বাচ্চু ভূঁইয়া বলেন, ‘সুরাইয়ার জন্য তার মা নাজমা বেগম একটি নতুন জামা কিনেছেন। এ ছাড়া আমার মতো অভাবি মানুষের পরিবারের পাঁচ সদস্যের খাবার জোগাতে হিমশিম অবস্থা। আমার কাছে ঈদ বছরের আর দশটি দিনের মতোই নিরানন্দের। ঈদে বাড়তি কোনো আনন্দ-আয়োজন নেই।’
অন্যদিকে বাচ্চু ভূঁইয়া নির্মম এ ঘটনার দ্রুত বিচার না হওয়া, অভিযুক্ত আসামিদের জামিনে মুক্ত হওয়ার ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি সরকারে প্রতি সুরাইয়াকে চিকিৎসা ও তাকে মানুষ করার দায়িত্বভার গ্রহণ এবং নির্মম এ ঘটনায় প্রকৃত দোষীদের দ্রুত শাস্তির দাবি জানান।
গত বছর ২৩ জুলাই শহরের দোয়ারপাড় এলাকায় মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সুরাইয়ার চাচা জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল ভূঁইয়ার সঙ্গে তারই সেকেন্ড ইন কমান্ড আলী আকবরের নিয়ন্ত্রণাধীন গ্রুপের সংঘর্ষ হয়। এ সময় এলোপাতাড়ি গুলিতে নিহত হন মমিন ভূঁইয়া নামে এক ব্যক্তি। গর্ভস্থ শিশুসহ গুলিবিদ্ধ হন গৃহবধূ নাজমা বেগম। ওইদিন রাতে মাগুরা সদর হাসপাতালের চিকিৎসকরা অপারেশনের মাধ্যমে সাড়ে সাত মাসের গুলিবিদ্ধ শিশুকে মায়ের পেট থেকে জীবিত বের করেন। পরে ২৫ জুলাই নাজমা বেগমের গুলিবিদ্ধ শিশুকন্যাকে সুরাইয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।
মামলার বিবরণ ও সর্বশেষ অবস্থা
মাতৃগর্ভে শিশু গুলিবিদ্ধ ও মমিন ভূঁইয়া নামে একজন নিহত হওয়ার ঘটনার তিন দিন পর নিহতের ছেলে রুবেল ভূঁইয়া বাদী হয়ে গত বছরের ২৬ জুলাই মাগুরা সদর থানায় ১৬ জনের নামে মামলা করেন। মামলার ১৬ আসামি হলেন, সুমন কুমার সেন ওরফে সেন সুমন, আলী আকবর, মেহেদী হাসান আজিবর, মুজিবর রহমান, সুমন আলী, ফরিদুর রহমান, সাগর, বাপ্পী গাজী, ইলিয়াস হোসেন, সোহেল মিয়া, লিটন মল্লিক, মিল্টন মল্লিক, নজরুল ইসলাম, সোবহান শেখ, সোলাইমান শেখ ও রানা করিকর। আসামিদের মধ্যে সেন সুমন জেলা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি, মেহেদী হাসান আজিবর ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য, পরবর্তীতে ঠিকাদার, আলী আকবর হাইস্কুলের দপ্তরি। অন্যরা কেউ ইলেকট্রিক মিস্ত্রি, ড্রাইভার, চা-দোকানি, মুরগি, সবজি ও মাছ বিক্রেতা।
আসামিদের মধ্যে মেহেদী হাসান আজিবর ওই বছরের ১৫ আগস্ট পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন।
পরে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির ওসি ইমাউল হক তদন্ত শেষে ২০১৫ সালের ৩০ নভেম্বর ১৭ জনের নামে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন।
এজাহারভুক্ত ১৬ জনের মধ্যে তিন নম্বর আসামি আজিবর ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ও ১৬ নম্বর আসামি রানাকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। অন্যদিকে চার্জশিটে নতুন করে অভিযুক্ত করা হয় জেলা সমবায়লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ তৈয়বুর রহমান তোতা, মুন্না ও আয়নাল শেখ নামে তিনজনকে।
আসামিদের মধ্যে মুজিবর রহমান পলাতক রয়েছেন। বর্তমানে আলী অকবর, লিটন মল্লিক, তৈয়বুর রহমান তোতা ও আয়নাল শেখ জেলহাজতে রয়েছেন। অন্যরা সম্প্রতি জামিনে মুক্ত হয়েছেন।

আরও পড়ুন