এসো কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র, এসো তুনাবী

আপডেট: 02:46:14 04/01/2018



img

আহসান কবির

যত দূরে যাও ফিরে আসাটাই প্রেম
দূর থেকে দেখা কপালের টিপ, আমার টোটেম!
নাকফুল যেন নীল ধ্রুবতারা, আত্মার হাতছানি
পাঁজর খোলার পর নিজেদের বলো, কতটুকু জানি?
প্রেমিক যায় না কোথাও! ফিরে ফিরে আসে
যাযাবর ঘরকেই বেশি ভালোবাসে

প্রিয় তুনাবী,
অথর্ব এবং উন্মাদ ডোনাল্ড  ট্রাম্পের দেশে কেমন আছ তুমি? ফিরবে না জানি, তবু তোমার ফেরার তুমুল প্রতীক্ষা নিয়ে বারবার জানতে চাই— কবে আসবে এই বাংলায়? তোমাকে আমার যতখানি নিজের এবং এই বাংলার মনে হয় তুনাবী, তারচেয়ে ঢের বেশি তুমি এখন নিজেকে আমেরিকান ভাবতে ভালোবাস! ঠিক যেমন আমেরিকানরা ভাবছে এখন। তারা ভাবছে— জেরুজালেম যতটা ইসরায়েলের, তার চেয়ে অনেক বেশি মনে হয় আমেরিকার! প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে তোমাদের দেশের অনেকেই ভাবত অথর্ব। জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পর অনেক আমেরিকান ট্রাম্পকে এখন উন্মাদ বলে ডাকে! তাও ট্রাম্প যা চান, তা করে দেখাতে পারেন। শুধু তুমি একবারও এই বাংলায় ফিরে আসতে পারনি!

তুনাবী,
তুমি না পারলেও হারিয়ে যাওয়ার পরও এ দেশের কেউ কেউ ফিরে আসতে পেরেছেন! আগে গুম ছিল, এখনও আছে। এ দেশের অনেকেরই হয়তো ঘুম ছিল না। ইদানীং গুম বা নিখোঁজ হওয়ার পর এক-দুইজন ফিরে আসা শুরু করেছেন। হারিয়ে যাওয়ার বেশ কিছুদিন পর ফিরে এসেছেন সিজার ও সাংবাদিক উৎপল। গত পাঁচ বছরের ভেতর সবচেয়ে বেশি মানুষ গুম, নিখোঁজ কিংবা হারিয়ে গিয়েছিলেন ২০১৭ সালে। এই সংখ্যা ৭৫। তুনাবী, এই পঁচাত্তর জনের ভেতর চরম ভাগ্যবান মানুষের সংখ্যা ৩৫। তারা ফিরে এসেছেন। তবে এই ৩৫ জনের ভেতর ১৯ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

তুনাবী,
বহুদিন পর আমি জানতে সক্ষম হয়েছিলাম যে তুমি আমেরিকা চলে গেছ। যে ১৯ জনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে, নিখোঁজ বা অপহরণের দুয়েকমাস পরে তাদের আত্মীয়-স্বজনরা জানতে পেরেছেন যে তাদের গ্রেফতার দেখানো হয়েছে! আমি তাই বছর শেষে আশাবাদী হয়ে উঠেছিলাম। আমার মন বলে, তুমি ফিরে আসবে তুনাবী। তোমার ফেরার পরে যদি আমাকে গ্রেফতারও করা হয়, তবু সেই গ্রেফতারকে আমি আনন্দের সঙ্গে বরণ করে নিতে রাজি। প্রেমের অন্য নাম নাকি হৃদয়ের হাতকড়া!
তবে ৭৫ জনের ভেতর চরম ভাগ্যহীন ৯ জনের লাশ পাওয়া গেছে। বাকি ৩৩ জনের ভাগ্য আমার মতো। তারা কোথায় আছে, কেমন আছে, বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে— কিচ্ছু জানা যায়নি। তুনাবী, তুমি চলে যাওয়ার পর আমি আসলে কী রকমভাবে বেঁচে আছি? ‘একবার এসে দেখে যা নিখিলেশ, কী রকমভাবে বেঁচে আছি আমি’র মতো কি তুনাবী একবারও আসতে পারতে না আমাকে দেখতে?
২০১৭ সালে মারা গিয়েছেন তোমার-আমার অনেক প্রিয় মানুষ।

তুনাবী,
দুটি সাপ্তাহিক পত্রিকার অফিসে তুমি আমার সঙ্গে দেখা করতে আসতে। এই পত্রিকা অফিস দুটি যার প্রকাশনীকে ঘিরে বেড়ে উঠেছিল, সেই সন্ধানী প্রকাশনীর (সচিত্র সন্ধানীর সম্পাদক) গাজী শাহাবুদ্দীন আহমেদ মারা গিয়েছেন ২০১৭ সালে। না ফেরার দেশে চলে গেছেন আমাদের স্মৃতিতে চিরজাগরুক নায়করাজ রাজ্জাক এবং গায়ক আব্দুল জব্বার। কোনও কান্নাতেই আর ফিরবেন না মেয়র আনিসুল হক, গায়ক বারী সিদ্দিকী কিংবা চট্টগ্রামের ‘বীর’খ্যাত মহিউদ্দীন চৌধুরী। ‘সেই যে চলে গেলে আর হায় এলে না ফিরে/কত যে খুঁজেছি তোমায় অকারণ অশ্রুজলে’— অনেকবার এই গান গিটার বাজিয়ে যিনি তোমাকে আর আমাকে শোনাতেন, সেই প্রয়াত গায়ক নিলয় দাশগুপ্তের বাবা সুধীন দাশগুপ্তও মারা গেছেন গত বছর। কবি নজরুলের গানের স্বরলিপি যতদিন থাকবে, থেকে যাবে সুধীন দাশগুপ্তের নাম। ‘নীল মণিহার’ আমাদের দিয়ে সীমান্তের ওপারে চলে গেছেন লাকি আখান্দ। কোনও ডাকেই তাকে আর ‘ফেরানো যাবে না’।
সাংবাদিক উৎপল আর সিজারের মতো যারা ফিরে এসেছেন, তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ কিন্তু তাদের উদ্ধার করতে পারেনি। এসব জায়গা থেকে লেনদেন ছাড়া কি ফিরে আসা সম্ভব? তোমাকে হারিয়ে আমি দুঃখ পেয়েছি, তুনাবী, কখনও শঙ্কিত হইনি। নিখোঁজ অবস্থা থেকে যারা ফিরছেন, তারা নিদারুণ শঙ্কায় ভুগছেন, সাহস করে কিছু বলতে পারছেন না। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানের ভাষ্য, ‘এখন তো রাষ্ট্রীয় বাহিনীকেই আমাদের সন্দেহ হচ্ছে!’

তুনাবী,
তোমার ভালোবাসার জন্য মরিয়া এই আমি হয়তো তোমাকে সন্দেহ করি। কিন্তু মুক্তমনে তোমার কথা লিখতে কোনও সমস্যা নেই। ঠিক তেমনভাবে সহনশীল মাত্রায় ঘুষ খেতে এখন হয়তো আর কোনও সমস্যা থাকবে না। কারণ শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সহনীয় মাত্রায় ঘুষ খেতে বলেছেন (ঘুষ ইজ ভেরি গুড ফর হেলথ)!

তুনাবী,
মনে আছে তোমাকে লেখা যে চিঠিটা তোমার বাবার হাতে পড়েছিল, সেটা নিয়ে তিনি কী নির্মম ঘটনা না ঘটিয়েছিলেন! আমার চিঠি ফাঁস হওয়ার মতো এখন নিয়মিত প্রশ্নপত্র ফাঁস হয় এ দেশে।

তুনাবী,
আমার মনে হয় ২০১৭ ছিল প্রশ্নপত্র ফাঁসের বছর। চাকরির প্রশ্নপত্র, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশ্নপত্র, মেডিক্যালের প্রশ্নপত্র, এসএসসি বা এইচএসসির প্রশ্নপত্র, এমনকি ক্লাস-ওয়ান টু’র প্রশ্নপত্রও ফাঁস হয়েছে গত বছরে! যদি এটা কোনও ষড়যন্ত্র হতো, তাহলে না হয় কিছু বলার থাকত না। প্রথমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ব্যাপারটি স্রেফ গুজব হিসেবেই প্রচার করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, যারা প্রশ্নপত্র ফাঁসের গুজব ছড়াবে তাদের তথ্যপ্রযুক্তি আইন ও মামলার আওতায় আনা হবে। এরপর খোদ শিক্ষামন্ত্রী বললেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের জন্য নাকি এক শ্রেণির শিক্ষক দায়ী। পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে, প্রথম শ্রেণির এক ‘করকর্মকর্তা’র নেতৃত্বেই এই প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশি তদন্তে দেখা গেছে, এই চক্রের সঙ্গে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগেরও কেউ কেউ জড়িত ছিল!
মাদক ব্যবসা এমনকি ধর্ষণের সঙ্গেও জড়িত ছিল ক্ষমতাসীনদের আশীর্বাদপুষ্ট কেউ না কেউ।

তুনাবী,
ভালোবাসাময় তোমার হাতের মতো মায়াবী ক্ষমতার ভিন্নরকম এক হাতও ছিল এই দেশে। সেই একদিন ছিল এ দেশের মানুষের। একজন মানুষের হাতের যাদুকরী সম্মোহনে সারাজাতি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যুদ্ধে নেমেছিল, ছিনিয়ে এনেছিল বিজয়ের পতাকা। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সেই অমর ভাষণ এখন ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ তথা বৈশ্বিক সম্পদ। ১৯৯২ সালে বিশ্বের দালিলিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও ব্যবহারে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে ইউনিসেফ ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ কর্মসূচি চালু করেছিল। এই তালিকায় যে ৭৮টি দলিল স্থান পেয়েছে, বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ সেই তালিকার ৪৮ নম্বরে।

তুনাবী,
সত্যি করে বলবে, তোমার হৃদয়ে আমার কোনও স্থান কিংবা আমাদের তুমুল প্রেমের সেই সব দিনের কোনও স্মৃতির লেশমাত্র কি এখনও অবশিষ্ট আছে? মানুষ নাকি স্মৃতির ওপর ভর করেই বাঁচে। স্মৃতির ফুলের যে ঘ্রাণ সেটা নাকি কখনও ম্লান হয় না। নিজ দেশে নির্মম নির্যাতন সহ্য করে, ধর্ষিতা হয়ে, পুড়ে বাড়িঘর ছাই হওয়ার পরে উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বার্মা থেকে যে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে, তারা কোন স্মৃতি নিয়ে বেড়ে উঠবে? সব হারানো এই রোহিঙ্গারা কোনও একদিন কি তাদের আশ্রয় ছেড়ে মিশে যাবে বাংলার জনসমুদ্রে? নির্যাতনের নির্মম স্মৃতি নিয়ে তারা কি ফিরতে পারবে মিয়ানমারে? মিয়ানমার কি তাদের আদৌ ফেরত নেবে?

তুনাবী,
আমি কি কখনও ফিরতে পারব তোমার কাছে? ২০১৭ সালটা কি আমার মতো সাগরভাসা এই সব অসহায় মানুষের বছর?

তুনাবী,
২০১৭ ছিল তোমার চলে যাওয়ার ২০ বছর পূর্তির বছর। ২০ বছরে অনেক কিছুই বদলে যায়, বদলায় না কেবল স্মৃতি। স্মৃতি আর অনুভবে এখনও অনন্য তুমি।

তুনাবী,
আমার অবস্থান তোমার কাছে এখন কেমন, সেটা আমি না জানলেও এই পৃথিবীর কোথাও এখন আইএস-এর অবস্থান নেই! তারা ইরাক, সিরিয়া ও ইরান থেকে বহিষ্কৃত এবং উচ্ছেদ হয়েছে। কথিত ধর্মযুদ্ধে তারা কোথাও টিকতে পারেনি। অসংখ্য মানুষের শিরশ্ছেদসহ অমানবিক অনেক ঘটনার জন্ম দিয়েছিল ধর্মান্ধ এই গোষ্ঠীটি। তুনাবী, বিশ্বাসের অন্ধত্ব কখনই মানুষকে আলোকিত করে না। অন্ধকারেই হারিয়ে যাক আইএসের সবকিছু।
যতই অন্ধকার নামুক, এই বাংলার মায়াভরা পথে হেঁটেছি অনেক দূর। ঝড়, বন্যা আর বজ্রপাতের উৎপাত কিংবা ফসলহানি আমাদের পথ রুদ্ধ করতে পারবে না। ২০১৭ সালে পাহাড় ধস আর বন্যায় এ দেশে সর্বস্ব হারিয়েছে অনেক মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৭০ লাখ মানুষ, সরকারি হিসেবে মারা গেছে ১২১ জন।

তুনাবী,
বড্ড বেশি মানুষ গেছে বানের স্রোতে ভেসে! পেঁয়াজ-চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম ছিল তুলনামূলক ঊর্ধ্বমুখী। আমেরিকা যেমন ট্রাম্পের হাত থেকে রক্ষা পায়নি, প্রকৃতির এই প্রতিশোধ থেকে এই বাংলা মুক্ত হতে পারল না আজও। আজও বাংলা মুক্তি পায়নি ষড়যন্ত্রের হাত থেকে। বিডিআর হত্যা মামলার রায়ে ১৩৯ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছেন হাইকোর্ট। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছে ১৮৫ জনের। রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, যে কারণে এ বিদ্রোহ হয়েছিল, তা ছিল অযৌক্তিক ও ভিত্তিহীন। সেনাবাহিনীর মনোবল নষ্ট করা, দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা এবং অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়াই ছিল হত্যাকাণ্ডের কারণ। বিদ্রোহে অভ্যন্তরীণ ও বাইরের ষড়যন্ত্র ছিল!
যতই ষড়যন্ত্র হোক, তুনাবী, যতই মনোবল ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা করা হোক, আমি কখনও সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার মতো হতে পারব না। আজীবন তোমার অন্ধ প্রেমিক থাকতে চাই। প্রেমিক কখনও তার প্রেম থেকে পদত্যাগ করতে পারে না। সুরেন্দ্রকুমার সিনহা প্রধান বিচারপতি ছিলেন ঠিকই, প্রেমিক ছিলেন কিনা কেউ বুঝতে পারেনি! পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ পদত্যাগে বাধ্য হওয়ার পর মানুষ তার দেশপ্রেম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিল। আসলে প্রেমিক যায় না কোথাও, ফিরে ফিরে আসে!
যেভাবে ফিরে আসে বদলে যাওয়া বাতাসের বেগ, বিনাশী আবেগ কিংবা ক্ষয়ে যাওয়া অভিমানী মেঘ, তেমন করে ফিরে এসো, তুনাবী। শঙ্কিত হয়ো না, ফিরে আসো তুনাবী, সিজার আর উৎপলের মতো। যত ভয় থাকুক, যত ভয় আসুক— শুধু তুমি পাশে থাকলেই মনে হবে, আমরা করবো জয় একদিন!
দেশবাসীর যেমন আশা একটি সুন্দর, সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের, ঠিক তেমনি আমারও আশা কাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্রের মতো তুমিও ফিরবে একদিন!
ইতি
তোমার ফেরার অপেক্ষায়
তোমারই চালচুলোহীন
মুনাদ
[লেখক : মিডিয়াকর্মী, রম্যলেখক, অভিনেতা। বাংলা ট্রিবিউন থেকে।]