একসঙ্গে আড়াই শতাধিক মুসল্লির ইতিকাফ

আপডেট: 02:11:57 15/06/2018



img
img

শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) প্রতিনিধি : ঘড়ির কাঁটা সকাল সাড়ে নয়টার অতিক্রম করেছে মাত্র। মাদরাসা প্রাঙ্গণে ঢুকতেই চোখে পড়ে দ্বিতল ভবনের ওপর ও নিচে সারিবদ্ধভাবে বসা মুসল্লিদের ‘লা ইলাহা ইল্লাহ’ জিকির। কাবা শরিফের দিকে মুখ ঘুরিয়ে সমবেতদের সমস্বরে জিকির সেখানে আলাদা পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
এমন অবস্থা কেবল গত বুধবার ঘটেছে তা নয়। বরং রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজধানী-খ্যাত ধুমঘাট এলাকায় গড়ে ওঠা এ মাদরাসায় রোজার শুরু থেকে এমন পরিবেশ বিরাজ করছে। এলাকার মুসল্লিদের পাশাপাশি দেশের প্রায় ৩৫-৩৬টি জেলা থেকে মুসল্লিরা এসে শরিক হয়েছেন এ মাদরাসার জিকির আসগারে।
শ্যামনগর-ভেটখালী সংযোগ সড়ক ধরে বংশীপুর থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার অগ্রসর হতেই প্যাঁচো সরদারের মোড় ধরে বামে আরো এক কিলোমিটার এগুতেই চোখে পড়ে জামিয়া ইসলামিয়া রশিদিয়া হোসাইনবাদ ধুমঘাট মাদরাসা।
২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও হাঁটি হাঁটি পা পা করে ইতিমধ্যে এ মাদরাসাটি দেশজুড়ে ব্যাপক সুনাম অর্জনে সমর্থ হয়েছে।
সরেজমিনে যেয়ে দেখা গেছে, ফজরের নামাজ থেকে শুরু করে ইফতার-পরবর্তী সময়ে মাদরাসায় অবস্থানরতরা জিকির আসগারে ব্যতিব্যস্ত।
সমবেতদের দাবি, মানুষ ইমান-আখলাক থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তারা দেশ ও ইসলামবিরোধী নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে। তাই আত্মশুদ্ধির জন্য সীমিত পরিসরে রমজান মাসে তারা এখানে এসে আল্লাহর ধ্যান-জ্ঞানে মশগুল থাকেন।
মাদরাসাটিতে বর্তমানে হেফজখানা, কেরাতখানা ও কিতাব বিভাগে অধ্যয়নের সুযোগ রয়েছে। যেখানে প্রায় ৪০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে।
নিত্যকার মতো আজ জোহরের নামাজের পর দেখা সমবেতদের সকলে মহান আল্লাহ পাকের করুণা ভিক্ষার নিমিত্তে স্ব-স্ব অবস্থানে বসে আবার জিকিরে মনোনিবেশ করেন। ‘আল্লাহ আকবর’ আর ‘লা ইলাহা ইল্লাহ’ ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয়ে উঠতে থাকে গোটা মাদরাসা প্রাঙ্গণ।
উপস্থিত মুসল্লিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সবাই সেখানে সমবেত হয়েছে ইতিকাফের নিয়তে। তাদের বিশ্বাস, রমজান মাসের নাজাতের শেষ দশ দিনের যেকোনো এক বিজোড় দিনে লাইললাতুল কদর আসে। যে কারণে অনেকে রোজার শুরু থেকে ইতিকাফে বসলেও অধিকাংশ মুসল্লি শেষ দশ দিনের জন্য ইতিকাফে বসেছেন আল্লাহর পানাহ লাভের আশায়।
তিনি ঢাকার কেরানীগঞ্জ থেকে এসে ইতিকাফে বসা হজরত মাওলানা রফিকুর রহমান বলেন, এবছর তৃতীয় রমজানে এলেও সময় সুযোগ পেলেই এ মাদরাসায় চলে আসেন বলে জানান তিনি।
তিনি আরো জানান, একটি ফিড কোম্পানির চাকুরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থাকার পরেও তিনি এখানে এসেছেন শতাধিক মানুষের সঙ্গে মিলে আল্লাহ পাকের জিকির আসগার করে আত্মশুদ্ধি লাভ এবং আল্লাহ পাকের অনুগ্রহ লাভের আশায়।
হবিগঞ্জ জেলা সদরে বাড়ি হলেও কর্মসূত্রে সিলেটে অবস্থানরত হাফেজ মাওলানা কুতুবুল আলম জানান, ইতিকাফের নিয়তে এটা তার দ্বিতীয় বার এ মাদরাসায় আসা। নিজের আমলকে আরো মজবুত করার মানসে তিনি সর্বক্ষণিক এবাদত বন্দেগিতে ব্যস্ত থাকেন দাবি করে বলেন, ১৩ বছর আগে এ মাদরাসার মোহতামিম নরসিংদী থাকার সময় তার সঙ্গে পরিচয়। পরে যোগসূত্র ধরে রোজার মাসে আল্লাহর একান্ত নৈকট্যলাভের আশায় এখানে চলে আসি এক মনে এবাদত করার লক্ষ্যে।
মাদরাসার মোহতামিম জানান, ফজরের নামাজের পর কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে বেলা এগারটা পর্যন্ত এস্তেগফার পড়া হয়। পরে গোসলসহ নানা কারণে কিছুটা বিশ্রাম মেলার পর জোহরের নামাজ শেষে আবার ‘লা ইলাহা ইল্লাহ’ জিকির চলে আছরের আগমুহূর্ত পর্যন্ত। ইফতারির আগ পর্যন্ত দরুদ এ ইব্রাহিম পাঠ করেই চলে তাদের আমলের প্রক্রিয়া।
এক পর্যায়ে ইফতারির পর খাবার শেষে এশা ও তারাবিহর পর সবাই বিশ্রামে চলে যান। তবে ইতিকাফে বসা অনেকে অধিকাংশ রাতে তাহাজ্জুদ নামাজের পাশাপাশি এখানে দোয়া-দরুদ পাঠ করে আল্লাহর সন্তষ্টি লাভের চেষ্টা করেন।
কুতুবুল ইসলামের সঙ্গে প্রাইভেট একটি হাসপাতালের এক চিকিৎসক জানান, এখানে আসার পর মনে হচ্ছে এভাবে নিয়মিত জিকির আজগর করলে আর মন থেকে আল্লাহ পাকের কাছে কিছু চাইলে কেউ বিমুখ হতে পারে না। বিশেষ করে এখানে আসার পর একসাথে প্রায় আড়াই শতাধিক মানুষের ইতিকাফে বসার দৃশ্য তাকে বিমোহিত করেছে।
বাড়ির পাশে তো অনেক মসজিদ-মাদরাসা রয়েছে, তারপরও এত দূরে কেনো এসেছেন?- এমন প্রশ্নের উত্তরে মুফতি মাওলানা হাফিজুর রহমান বলেন, ‘লোকমুখে শুনেছি, এখানকার পরিবেশ আমলের জন্য অনেক উপযোগী। তাছাড়া বাড়ির কাছাকাছি থাকলে নানামুখী চিন্তা-ফিকিরে আমলে মন দেয়া যায় না। যে কারণে দূর হলেও এখানে এসে মনের খোরাক মিটিয়ে আমলের সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে।’
সেনাবাহিনী ও র‌্যাবে কর্মরত থাকার পর সদ্য অবসরে যাওয়া আহসানুল আলম বলেন, ‘কিশোরগঞ্জ বাড়ি হলেও এখন আমি খুলনায় থাকি। বাড়িঘরে থাকলে ঠিকমতো এবাদত বন্দেগিতে অনেক বাধাবিঘ্ন আসে। তাই আল্লাহ পাকের সান্নিধ্য লাভের নিমিত্তে নির্জন এমন একটা জায়গায় চলে এসেছি। একত্রে দুই শতাধিক মানুষের সাথে ইতিকাফে শরিক হওয়ার ভাগ্য হওয়ায় আল্লাহ পাকের শুকরিয়া আদায় করছি।’
দেশের প্রায় ৩৫টি জেলা থেকে আসা মুসল্লিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জামিয়া ইসলামিয়া রশিদিয়া হোসাইনবাদ ধুমঘাট মাদরাসা এতদাঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে বড় ইতিকাফের জায়গা। অবকাঠামোর দিক থেকে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও ইতিমধ্যে মাদরাসাটি ইতিকাফের জন্য দেশজুড়ে সাড়া ফেলেছে বলে আগতদের দাবি।
মাদরাসা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছর দুই শতধিক মুসল্লি ইতিকাফের জন্য এখানে এসেছিলেন। এবার সে সংখ্যা আড়াইশ ছাড়িয়ে গেছে। আগামীতে এ সংখ্যা আরো বাড়ার সম্ভাবনায় ইতিমধ্যে তারা দ্বিতল ভবনের দক্ষিণ পাশে আরেকটি ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করেছেন।
কর্তৃপক্ষ জানান, ইতিকাফে বসা অতিথিরা ঈদের চাঁদ ওঠার পরপরই যে যার বাড়ি এবং কর্মস্থলের উদ্দেশে মাদরাসা ছেড়ে যাবেন।

আরও পড়ুন