উন্নয়ন মেলায় খুলনা উন্নয়নের নানা চিত্র

আপডেট: 02:43:16 11/01/2017



img
img

খুলনা অফিস : দর্শনার্থীদের ভিড়ে জমে উঠেছে সার্কিট হাউজ মাঠের উন্নয়ন মেলা প্রাঙ্গণ। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা মেলায় ঘুরে সরকারের উন্নয়নের নানা বিষয়ে অবহিত হচ্ছে। মেলার প্রধান ফটকে শোভা পাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর হাস্যোজ্জ্বল ছবিসহ ‘শেখ হাসিনার দর্শন সব মানুষের উন্নয়ন’ লিখিত পোস্টার। মেলার বিভিন্ন স্টলের প্রদর্শনীতে সেবার নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে।
বুধবার বিকেলে সেরা স্টলকে পুরস্কৃত করার মধ্য দিয়ে মেলা শেষ হবে। এর আগে ৯ জানুয়ারি বিকেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে খুলনার উন্নয়ন মেলার উদ্বোধন করেন।
সরেজমিনে গিয়ে মেলায় প্রায় ১১০টি স্টলে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি দপ্তর ও সংস্থাকে উন্নয়ন সেবাসমূহ প্রদর্শন করতে দেখা যায়। জনসেবায় উন্নয়নমূলক কার্যক্রম প্রদর্শনে বিভিন্ন দপ্তরের মাঝে ব্যাপক উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে।
বিগত আট বছরে খুলনায় বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে অসংখ্য উন্নয়নমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়েছে। মেলায় তারই উল্লেখযোগ্য কিছু বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে গণপূর্ত-১ কর্তৃক খুলনায় ১৩টি হাসপাতাল ভবন, ছয়টি থানা ভবন সংস্কার, সাতটি র‌্যাব কমপ্লেক্স, নতুন পাসপোর্ট অফিস, সিজেএম আদালত ভবন, নতুন সার্কিট হাউজ নির্মাণসহ মোট ৪০টি নতুন স্থাপনা নির্মাণ করেছে।
গণপূর্ত-২ বিভাগের জেলা পুলিশ ও কেএমপির ছয় তলা ব্যারাক, নতুন খালিশপুর থানা ভবন, রেঞ্জ রিজার্ভে চারতলা ব্যারাক, কয়রায় নতুন থানা ভবন নির্মাণ কাজ শেষ করেছে। এছাড়া নতুন জেলা কারাগার, মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স, টেক্সটাইল ইন্সটিটিউট, ইউনিয়ন ভূমি অফিস নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে।
খুলনা জেলা পরিষদ প্রায় ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মন্দির উন্নয়ন, ঈদগাহ, এতিমখানা, কবরস্থান স্থাপন ও উন্নয়ন করেছে। আরো দুই কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে গল্লামারী স্মৃতিসৌধ নির্মাণ, কম্পিউটার ল্যাব নির্মাণ, ডিজিটাল সেন্টার স্থাপনে সহায়তা ছাড়াও দরিদ্র মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের বৃত্তি প্রদান করেছে। এলজিইডি খুলনার তত্ত্বাবধানে পাকা রাস্তা ৮৮৪ কিলোমিটার, ব্রিজ-কালভার্ট এক হাজার ৭৯৭ কিলোমিটার, সাইক্লোন শেল্টার ৫৩টি, প্রাইমারি স্কুল ৩৪৩টি, মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ছয়টি, ইউপি কমপ্লে¬ক্স ১৭টি, উপজেলা পরিষদ ভবন একটি, উপজেলা সার্ভার স্টেশন একটি নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। ওজোপাডিকো লি. এর গৃহীত পদক্ষেপে গ্রাহক বেড়েছে তিন লাখ ৮২ হাজার ২৭৮ জন, সিস্টেম লস কমেছে ২ দশমিক ২৪ শতাংশ, নতুন ৩৩ কেভি লাইন স্থাপন ১৯৮ কিলোমিটার, নতুন ১১ ও ০.৪ কেভি লাইন এক হাজার ৩২৩ কিলোমিটার, ১৭৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার বৃদ্ধিসহ ৬৬৯টি প্রিপেইড মিটার স্থাপন বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এনেছে।
খুলনা ওয়াসার তত্ত্বাবধানে ডিপ টিউবওয়েল স্থাপন ৪৪টি, ওভারহেড ট্যাংক নির্মাণ ১১টি, ট্রান্সমিশন পাইপ লাইন স্থাপন ১৩ কিলোমিটার, ডিস্ট্রিবিউশন পাইপ লাইন যথাক্রমে ৫৯ কিলোমিটার এবং ২২০ কিলোমিটার স্থাপন সম্পন্ন, রিজার্ভার নির্মাণ সাতটি, গৃহসংযোগ মিটার সাত হাজার ৫০০টি স্থাপন করা হয়েছে। স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর জানায়, খুলনার বটিয়াঘাটা, তেরখাদা ও দিঘলিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ। ৫১টি নতুন কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণসহ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র নির্মাণ ও সংস্কার সম্পন্ন হয়েছে।
এছাড়া বৃহৎ প্রকল্পের মাঝে ৭৬ কোটি টাকা ব্যয়ে খুলনা ও বেনাপোল আধুনিক রেলওয়ে স্টেশন নির্মাণ, ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক খুলনা জেলা স্টেডিয়াম নির্মাণ, ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে জেলা ও বিভাগীয় শিল্পকলা একাডেমি নির্মাণ, দুই হাজার ৫৫৮কোটি টাকা ব্যয়ে খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্প (খুলনা ওয়াসা) বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।
খুলনা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের স্টল থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, এখান থেকে বিভিন্ন মেয়াদে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যা আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে। এসব প্রশিক্ষণের মেয়াদকাল তিন মাস, চারমাস ও ছয়মাস। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বাটিক, টেইলরিং, বিউটিফিকেশনে প্রশিক্ষণ সহ হাঁস-মুরগি পালন, মাছ চাষ, কৃষি বিষয়ক প্রশিক্ষণ এবং ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী যেমন, কম্পিউটার, টেলিভিশন, এয়ারকন্ডিশনার, ফ্রিজ ইত্যাদি রিপেয়ারিং এ প্রশিক্ষণ প্রদান। এসব ট্রেনিং থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হয়ে অসংখ্য যুবক-যুবতী বেকারত্বের অভিশাপ কাটিয়ে উঠছে। গত আট বছরে খুলনা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে ৩৯ হাজার ৫৭১ জন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে ২২ হাজার ৩৯০ জন স্বাবলম্বী হয়েছে।
‘বৈদেশিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন ও নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য’ ব্যানারে এমন উক্তি শোভা পাচ্ছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খুলনা, মহিলা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খুলনা এবং জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস খুলনার প্যাভিলিয়নে। কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খুলনায় ১৪টি ইনজিনিয়ারিং ট্রেডে দুই বছর মেয়াদী, এসএসসি ভোকেশনাল কোর্সে ২২টি ট্রেডে দুই মাস থেকে দুই বছর মেয়াদী ভিন্ন ভিন্ন ট্রেডে দক্ষতা উন্নয়ন কোর্সে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। মহিলা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ছয়টি ভিন্ন ভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণের মাধ্যমেও প্রশিক্ষণার্থীদের দেশে এবং বিদেশে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণসহ কর্মউপযোগী করে গড়ে তোলা হয়। খুলনা জেলার দিঘলিয়া ও পাইকগাছা উপজেলায় দুটি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।
জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস খুলনার উল্লেখযোগ্য সেবার মধ্যে কর্মক্ষম যুবক ও যুব মহিলাদের বিদেশে চাকরি লাভের জন্য অনলাইন নিবন্ধন, অভিবাসন সংক্রান্ত তথ্য সেবা, বিদেশে মৃত কর্মীর লাশ ফেরত আনা ও তাদের উত্তরাধিকারীদের আইনি সহায়তা প্রদান, অভিবাসন সংক্রান্ত অভিযোগ গ্রহণ, প্রবাসী কর্মীর মেধাবী সন্তানদের মধ্যে শিক্ষা বৃত্তি প্রদান করা হয়। ২০০৯ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত বর্তমান সরকারের আমলে খুলনা থেকে ১৯ হাজার ২৩ জন চাকরি নিয়ে বিদেশে গেছেন।
বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পাট অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ জুটমিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) প্যাভিলিয়নে পাটের বহুমুখী ব্যবহার এবং পাটজাত পণ্যের উন্নয়নে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের বিবিধ প্রদর্শনী শোভা পাচ্ছে। খুলনা জেলায় এ পর্যন্ত ১২ হাজার পাট চাষিকে কৃষি সহায়তাসহ এক হাজার ২০০ জন পাট চাষিকে উন্নত পদ্ধতিতে পাট চাষের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পাটজাত মোড়ক বাধ্যতামূলক আইন ২০১০ প্রবর্তন করায় পাটের অভ্যন্তরীণ ব্যবহার ও চাহিদা বেড়েছে। বিগত আট বছরে পাট অধিদপ্তর ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১১ লাখ ৫৮ হাজার ৩০০ টাকা জরিমানা আদায় করেছে এবং বিভিন্ন প্রকার লাইসেন্স এবং মামলা থেকে এক কোটি ৪৩ লাখ চার হাজার ৪৫০ টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে।
বিজেএমসির খুলনাঞ্চলে মোট নয়টি পাটকলের সরকারি ঋণ পরিশোধ ও পুনঃঅর্থায়নের মাধ্যমে পাটকলগুলো সচল রাখাসহ প্রায় ৫০ হাজার শ্রমিক কর্মচারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
খুলনার জেলা প্রশাসক নাজমুল আহসান জানান, মেলায় জেলার সব সরকারি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে। এতে জনগণের ব্যাপক অংশ গ্রহণ লক্ষ্য করা গেছে। বুধবার বিকেলে সমাপনী অনুষ্ঠানে সেরা স্টল নির্বাচিত করে পুরস্কৃত করা হবে।

আরও পড়ুন