উদ্বোধনের অপেক্ষায় ১১ বছর!

আপডেট: 02:05:09 29/06/2016



img

আব্দুস সামাদ, সাতক্ষীরা : দীর্ঘ ১১ বছরেও উদ্বোধন হয়নি সাতক্ষীরা কালেক্টরেট চত্বরে নির্মিত শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ। তাই সেখানে শ্রদ্ধাঞ্জলি দেন না কেউ। নির্মাণের পর থেকেই অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভটি।
অভিযোগ ওঠে, নির্মাণকালে এই স্মৃতিস্তম্ভে একজন ‘রাজাকার’ ও পাঁচজন ‘অমুক্তিযোদ্ধার’ নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়; যা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা। তারা শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ থেকে রাজাকার ও অমুক্তিযোদ্ধাদের নাম বাদ দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন। একই সঙ্গে যে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের নাম স্মৃতিস্তম্ভে স্থান পায়নি, তাদের নাম অন্তর্ভুক্তির দাবি জানাতে থাকেন মুক্তিযোদ্ধারা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘ ১১ বছর ধরে বিষয়টি নিয়ে চিঠি চালাচালি চলছে। কিন্তু কথিত একজন রাজাকার ও পাঁচ অমুক্তিযোদ্ধার নাম বাদ দেওয়া এবং বাদ পড়া শহীদদের নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। তাই উদ্বোধনও হয়নি স্মৃতিস্তম্ভটি।
বিষয়টি নিষ্পত্তি হতে বিলম্ব হওয়ায় সাতক্ষীরার সদ্য-সাবেক জেলা প্রশাসক নাজমুল আহসান কোনো নাম ছাড়াই জেলার সব শহীদের স্মৃতি রক্ষার্থে স্মৃতিস্তম্ভটি উদ্বোধনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবায়নের আগেই তিনি খুলনায় বদলি হয়ে যাওয়ায় তা আর সম্ভব হয়নি।
জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সূত্র জানায়, ২০০৫ সালের ২৬ এপ্রিল তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী আমানউল্লাহ আমান জেলা কালেক্টটরেট চত্বরে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। গণপূর্ত বিভাগ ১২ লাখ টাকা ব্যয়ে স্তম্ভটি নির্মাণ করে। ২০০৫ সালেই এর নির্মাণকাজ শেষ হয়। এতে সাতক্ষীরা জেলার ৩১ জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। কিন্তু স্মৃতিফলকে একজন ‘রাজাকার’ ও পাঁচজন ‘অমুক্তিযোদ্ধার’ নাম স্থান পাওয়ায় ক্ষুব্ধ হন মুক্তিযোদ্ধারা। একপর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধাদের বাধার মুখে ফলকটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠান স্থগিত হয়ে যায়।
সাতক্ষীরা জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তৎকালীন কমান্ডার ইনামুল হক বিশ্বাস জানান, শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে নির্মিত ওই স্মৃতিফলকে কলারোয়ার বাগডাঙ্গা গ্রামের গোলাম রহমানের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অথচ তিনি একজন চিহ্নিত রাজাকার বলে দাবি এই মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের। এছাড়া একই উপজেলার এমএম এন্তাজ আলী, অজিয়ার রহমান ও তালা উপজেলার সৈয়দ আবুল হোসেন ও বেদার বখত, সদর উপজেলার ক্যাপ্টেন কাজীর নাম স্থান পেয়েছে। তারা কেউ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেননি বলে ইনামুল হক বিশ্বাস জানান।
তিনি আরো জানান, সাতক্ষীরার কাটিয়া গ্রামের শহীদ আব্দুস সাত্তার ও সদর উপজেলার কায়োনডাঙ্গা গ্রামের শহীদ মুনসুর আলীসহ বেশ কয়েকজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নাম স্মৃতিফলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বাধ্য হয়ে ২০১২ সালের ১ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা সংঘবদ্ধ হয়ে ‘রাজাকার’ ও ‘অমুক্তিযোদ্ধাদের’ নামগুলো কালো কালি দিয়ে মুছে দেন। একই সঙ্গে কালো কাপড় দিয়ে স্মৃতিস্তম্ভটি ঢেকে দেওয়া হয়। এসময় বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন মুক্তিযোদ্ধা ইনামুল হক বিশ্বাস।
জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের বর্তমান কমান্ডার মশিউর রহমান মশু জানান, ২০০৫ সালে শহীদ স্মতিস্তম্ভ নির্মিত হওয়ার পর ওই ফলকে ‘রাজাকার’ ও ‘অমুক্তিযোদ্ধাদের’ নাম দেখে ২০০৬ সালের জানুয়ারি মাসে বিষয়টি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিবকে লিখিতভাবে জানানো হয়। ওই দরখাস্তের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াসকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে আবার যাচাই-বাছাই করে একটি তালিকা পাঠানোর জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর একাধিকবার মন্ত্রণালয়ে চিঠি চালাচালি করেও কাজের কাজ কিছু হয়নি।
‘বিষয়টি নিয়ে বার বার বলা হলেও কর্তৃপক্ষ কর্ণপাত করছে না’ বলে অভিযোগ করেন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মশিউর রহমান মশু।
একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি সাতক্ষীরা জেলা শাখার সদস্য সচিব হাফিজুর রহমান মাসুম জানান, মহান স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে কোনো স্মৃতিফলক সাতক্ষীরায় নেই। কালেক্টরেট চত্বরে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হলেও এতে ‘বিতর্কিতদের’ নাম অন্তর্ভুক্ত করায় ১১ বছরেও তা উদ্বোধন করা হয়নি। যেসব শহীদের নাম বাদ পড়েছে তাদের নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। যতদ্রুত সম্ভব বিষয়টি নিষ্পত্তি করে স্মৃতিস্তম্ভটি উদ্বোধন করার দাবি জানান তিনি।
সাতক্ষীরার বর্তমান জেলা প্রশাসক আবুল কাসেম মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘বিষয়টি দুঃখজনক। আমি সাতক্ষীরায় যোগদানের পর শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের বিষয়টি শুনেছি। বিষয়টি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে বসব এবং যতদ্রুত সম্ভব উদ্বোধনের চেষ্টা করব।’
সমস্যা নিষ্পত্তি করে আগামীতে এই স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন জেলা প্রশাসক।

আরও পড়ুন